সড়ক যোগাযোগে একই নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে সারাদেশ

‘পদ্মা সেতু’ যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক নেটওয়ার্কর আওতায় আসবে পুরো দেশ। এরমধ্য দিয়ে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার দীর্ঘ দিনের বঞ্চনার অবসান ঘটবে। আর টেকনাফ থেকে তেতুঁলিয়া, সুনামগঞ্জ থেকে সুন্দরবন, পাথরঘাটা থেকে পঞ্চগড়ে চলাচল করা যাবে কোন রকম বাধাবিঘ্ন ছাড়া।
আজ সকাল ১০টায় দ্বার উম্মোচন হচ্ছে বহুল প্রতিক্ষীত পদ্মা সেতুর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকালে সেতুর মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে আনুষ্ঠানিকভাবে সেতুর ফলক উম্মোচন ও মোনাজাত করার মধ্য দিয়ে সেতুর উদ্বোধন করবেন।
কিন্তু আজ শনিবার (২৫জুন) সেতু উদ্বোধন হলেও সর্বসাধারণের যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে রবিবার (২৬ জুন) সকাল থেকে। তারপর সেতু দিয়ে পদ্মা অতিক্রমে যানবাহনের দীর্ঘ সারি পড়বে- এমনটাই ধারণা করছেন সেতু সংশ্লিষ্টরা।
পদ্মা সেতু শুধু রাজধনী ঢাকা নয়, দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চলের সব জেলার সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সংযোগ স্থাপন করবে। এক কথায় সড়ক যোগেোগের ক্ষেত্রে সারাদেশকে একই নেটওয়ার্কর আওতায় নিয়ে আসবে। দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা পরিবর্তন, দেশের অর্থনীতি বদলে দেওয়ার মূল চালিকা শক্তিও হয়ে উঠবে এই পদ্মা সেতু। প্রাথমিকভাবে দেশের জিডিপি যোগ করবে এক দশমিক ২৭ শতাংশ।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজেএমইএ-এর সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এটি শুধু দক্ষিণাঞ্চল নয়, সারাদেশের অর্থনীতিরই মূল চালিকাশক্তি। সারাদেশের যোগাযোগও একটি নেটওয়র্কের আওতায় আসবে। এসব বিষয় মাথায় নিয়েই এই রুটগুলোতে নতুন নতুন বিলাসবহুল বাস যুক্ত করছে পরিবহন কোম্পানিগুলো। এখাতে নতুন নতুন বিনিয়োগও হচ্ছে।
পদ্মা সেতুর কারণে যোগাযোগের যে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে সেই উপলক্ষ্যে ইতিমধ্যে নানা তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। রুট পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। ভাড়াও সমন্বয় করা হয়েছে।
যোগাযোগের এই অভাবনীয় সম্ভাবনার ফলে বেনাপোল, ভোমরা, মংলা ও পায়রা বন্দরও নতুন রূপে তৎপর হয়েছে। এই উপলক্ষ্যে ইতিমধ্যে সিমেন্ট ও গার্মেন্টস কারখানাসহ কিছু শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ ঢাকাপ্রকাশ-কে বলেন, পদ্মা সেতু দিয়ে গাড়ি চালাতে আমরা প্রস্তুত। উদ্বোধনের পরদিনই গাড়ি চলবে। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া দিয়ে যে গাড়িগুলো চলত সেইসব গাড়ি পদ্মা সেতু দিয়ে চালাবো।
দূরত্ব কমবে ১০০ কিলোমিটার, সময় বাঁচবে ২ ঘণ্টা
এতদিন গাড়ি পার হতো পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিঘাট দিয়ে। কিন্তু ফেরিঘাটের নিত্য যানজটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্ট ঘাটেই পড়ে থাকতে হচ্ছে যানবাহনগেুলোকে। এরপর ১৯৮৬ সালে যখন মাওয়া দিয়ে ফেরি পারাপার শুরু হলো তখন ১০০ কিলোমিটার পথ কমল। কিন্তু কিন্তু দুর্ভাগ আর ঘাটে অপেক্সার সময় আর কমল না। এই যন্ত্রণাকে সঙ্গে নিয়েই বছরের পর বছর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষকে পদ্মা পার হতে হয়েছে। সেই দিনের অবসান ঘটতে যাচ্ছে আর একদিন পর।
২৬ জুন থেকে পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন পারাপারের কারণে দূরত্ব যেমন কমবে ১০০ কিলোমিটার তেমনি সময়ও বাঁচবে ২ ঘণ্টা। ঢাকার গাবতলী হয়ে পাটুরিয়া ফেরিঘাট দিয়ে বরিশালের দূরত্ব এখন ২৪২ কিলোমিটার। পদ্মা সেতু চালু হলে সায়েদাবাদ থেকে বরিশালের দূরত্ব হবে ১৫৬ কিলোমিটার। এরকমভাবে ২১টি জেলারই দূরত্ব কমবে।
যোগাযোগের এই ব্যাপক সম্ভাবনার বিষয়টি মাথায় রেখে ব্যাপক কার্যক্রম চলছে ওপারের জেলাগুলোতে। বিভিন্ন জেলায় ৫টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করবে সরকার। মংলা বন্দরের উন্নয়নেও নেওয়া হয়েছে মহাপরিকল্পনা। পায়রা বন্দরও সেভাবেই প্রস্তুত হচ্ছে। বলা যায়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়নে আসবে নতুন জোয়ার।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আনোয়ার হোসেন বলছেন, পদ্মা সেতু চালু হলে যশোর থেকে ঢাকায় যাওয়া যাবে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টায়। বিমানেও কমবেশি একই সময় লাগে। এই একটি উদাহরণ থেকেই বোঝা যাচ্ছে মানুষের যোগাযোগ কতটা সহজ হবে।
পণ্য পরিবহনে নতুন দিগন্ত
পদ্মা সেতুর কারণে যোগাযোগ দ্রুত হবে এমন ধারণা থেকেই যশোর, খুলনাসহ অনেক এলাকার কৃষক, ব্যবসায়ী ও খামারিরা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। যাতে করে পদ্মা সেতু চালু হলেই তারা সুবিধা কাজে লাগাতে পারেন। পরিবহন ব্যবসায়ীরাও নতুন নতুন বিনিয়োগ করছেন।
শরীয়তপুর বাস মালিক সমিতির কোষাধ্যক্ষ আব্দুল খালেক বলেন, পদ্মা সেতুর ফলে সব খাতের ব্যবসায়ীরা সহজেই ঢাকায় যাওয়া-আসা করতে পারবেন। যোগাযোগের সমস্যার কারণে এই এলাকার মাছ কখনো ঢাকার বাজারে যেতে পারেনি। এখন ব্যবসা থেকে শুরু করে চিকিৎসা- সব কিছুতে পরিবর্তন আসবে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির ভিত্তি ধরা হয় খুলনা-বাগেরহাটের মাছ, বরিশালের ধান ও পানকে। এছাড়া নদী এলাকা বলে প্রাকৃতিক উৎস থেকেও আসে বিপুল মাছ। উদ্যোক্তরা বলছেন, মাছসহ সব ধরনের পণ্য পরিবহন এখন সহজ হবে।
তবে সংশ্লিষ্টরা এটাও বলছেন, যোগাযোগের এই সুবিধা কাজে লাগাত হলে সেই ধরনের অবকাঠামো লাগবে। পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতেরও ব্যবস্থা করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, পদ্মা সেতু যোগাযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই সুবিধাকে অর্থনৈতিক সুবিধায় রূপান্তর করতে হলে গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং অবকাঠামো উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে।
এনএইচবি/
