মুজিব ও রাষ্ট্রন্নেছা

একাত্তরের জুলাই মাস। নওয়াপাড়ার হিন্দুদের বাড়িগুলো এখন রাজাকারদের দখলে। ওদের চক্ষুলজ্জা ও ভয়- আর অবশিষ্ট নেই। এখন মুক্তিকামী মুসলমান বাড়িগুলোর উপরও শ্যেনদৃষ্টি ফেলা শুরু করেছে। স্বাধীনতাকামী সকলেই আজ শংকিত ও বিপদগ্রস্থ। যেসব বাড়ি থেকে দু’একজন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে তাদের আজ মহাতংক। সেই মহাতংক বিরাজ করছে প্রফেসর আরজের বিশাল বাড়িটিতেও। প্রফেসরের বড়ভাই মিরাজ টের পান, ক্রমান্বয়ে পাকি দালালদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও বর্বরোচিত আচরণ বেড়েই যাচ্ছে। যে কোন মূহুর্তে অকাজ-কুকাজ তারা ঘটিয়ে ফেলতে পারে! সেই দুর্ভাবনায় আল্লাহ আল্লাহ করে কেটে যাচ্ছে তাঁদের দিন। টানা দেড় মাস যাবত আরজও নেত্রকোণা কলেজ থেকে বাড়ি আসার সুযোগ পাননি।
১৬ জুলাই ভোরবেলা। মিরাজের ঘর আলো করে ভূমিষ্ট হলো এক পুত্রসন্তান। আতংক, বেদনা ও শংকার মাঝেও সবার হৃদয়ে দোলা দিলো নতুন আনন্দের। কারণ, এ শিশুই হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশে এই পরিবারের প্রথম সন্তান। সকলেরই ভাবনা- ছেলেটির সুন্দর নাম রেখে আকীকা সম্পন্ন করা। কিন্তু আরজ ছাড়া যথার্থ নামটি রাখবে কে?
ডেকে আনা হলো আরজের বাল্যবন্ধু জব্বারকে। যেতে হবে নেত্রকোণায়। আরজকে দেখেও আসবে, আবার সন্তান জন্মের খবরটিও দিয়ে আসবে। প্রসূতি সিরাজুন্নেছা এ সুযোগে আরজের কাছে চিঠি লিখতে শুরু করেন-
প্রিয় ভাইসাব,
আসসালামু আলাইকুম! আশাকরি আল্লাহর রহমতে ভালোই আছেন। জেনে খুশী হবেন যে, আল্লাহর রহমতে আমাদের ঘর আলো করে আরো একজন পুত্রসন্তান জন্মগ্রহন করেছে। ও দেখতে একেবারে আমার শ্বশুরবাবার মতো। আপনাকে না পেয়ে পুরো আনন্দ থেকে আমরা বঞ্চিত। শ্বাশুড়িমা’র চাপে আপনার ভাই আগের নামগুলোর সাথে মিলিয়ে ওর নাম রেখেছেন- নূরুল ইসলাম। জানিনা এ নাম আপনার পছন্দ হবে কিনা। কিন্তু আমরা এখনো অপেক্ষায়, বরাবরের মতো আপনার কাছ থেকে সুন্দর একটি নাম পাবার আশায়। এপ্রিলে আপনি রাজ্জাকের মেয়েটির নাম ‘রাষ্ট্রন্নেছা’ রাখাতে ধারণা হচ্ছে- বাড়িতে থাকলে হয়তো এ নামটিও অন্যরকম রাখতেন।
আরেকটি কথা। প্রায়শই আপনার পাঠানো লোকজন আমাদের বাড়িতে অবস্থান করে। তারপর ছদ্মবেশে ভারতের দিকে চলে যায়। গ্রামের দু’একজন এবং জহরগাঁও ও কাঁটাখালির কিছু ভিক্ষুক- তালাশী নজরে এসব খেয়াল করে। মেহমানদেরকে নিয়ে নানান প্রশ্ন করে। আপনি এসব বিষয়ে আরো সতর্ক থাকবেন। দেশের অবস্থা ভয়াবহ! সবসময় দুঃশ্চিন্তায় থাকি। সময়-সুযোগে বাড়িতে আসবেন। জয় বাংলা! ইতি-
আপনারই ভাবী,
সিরাজুন্নেছা
১৯-০৭-৭১
জব্বার দুপুরের ট্রেনেই নেত্রকোণায় যাত্রা শুরু করবেন। পাজামার উপর তিনি পড়েছেন শর্ট-পাঞ্জাবী। অভ্যাস না থাকলেও- নিরাপত্তার স্বার্থে মাথায় লাগিয়েছেন জিন্নাহ টুপি। তারপরেও চিঠিটিকে পাঞ্জাবির পকেটের বদলে আন্ডারওয়্যারের গুপ্ত পকেটে পুরে নিয়েছেন। কারণ, ইদানীং চিঠিপত্র চেক করেও পাকিবাহিনী বহু লোকজনকে হত্যা করছে। আল্লাহ আল্লাহ জঁপে গোধূলি লগ্নে তিনি পৌঁছে যান- নেত্রকোণা কলেজের প্রফেসর’স মেসে।
জব্বারকে দেখেই আরজ আনন্দে লাফিয়ে উঠেন। যার সাথে তাঁর আবাল্যকালের সখ্যতা। বাড়ির সাথে তাঁর যোগাযোগের মাধ্যম ওই। বাড়ির সবকিছু এখনো অক্ষত জেনে- আরজ আল্লাহর কাছে শোকর গোজার করতে থাকেন। জব্বার আন্ডারওয়্যারের গুপ্তপকেট থেকে চিঠিটি বের করে আরজের হাতে ধরিয়ে দেন। চিঠির প্রথমাংশ পড়ে আনন্দে লাফিয়ে উঠলেও, দ্বিতীয়াংশ পড়ে চিন্তিত হয়ে বলতে থাকেন- জব্বার, আমাদের বাড়িতে লোকজন গেলে- কারা খোঁজ-খবর নেয়? কারা জিজ্ঞাসাবাদ করে?
- প্রথমত, তোমার প্রতিবেশীরা; দ্বিতীয়ত, জহরগাঁও ও কাঁটাখালির দু’তিনটি ভিখারিণী। এরা সামিদ-আনছর মেম্বারের গোয়েন্দা। নেপথ্যে শান্তি-কমিটির চেয়ারম্যান সেতাব আলী। এখন হিসাবটা মিলাও।
আরজ ভেবে দেখেন- ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত নির্বিঘ্নে তরুণ-যুবারা মেঘালয়ের ইউথ-ক্যাম্পে যেতে পেরেছে। নিজেই তো কয়েকবার অনেককে মেঘালয়ে পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু ২৯ এপ্রিল দুর্গাপুরে পাকি মিলিটারিরা আস্তানা গাড়ার পরে রাজাকারদের মতিগতি বদলে যায়! ফলে ভারতে যাওয়া ঝুঁকিবহুল হয়ে দাঁড়ায় দূরবর্তী তরুণ-যুবাদের জন্য। তাদেরই জন্যে আশ্রয়, খাবারের ব্যবস্থা এবং রাস্তাঘাটের দিকনির্দেশনামূলক সহায়তা করে যাচ্ছিলেন তিনি। বর্তমানে তাঁর বাড়ির উপর নজরদারীর খবরে ভীষণ দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ তিনি! যারা গোয়েন্দাগিরি করাচ্ছে- তারা স্বাধীনতা-বিরোধী এবং পুরনো শত্রু! এমতাবস্থায় সিদ্ধান্তে পৌঁছেন- বিকল্প হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়ের জন্যে তিনি দেবেন তাঁর ঘনিষ্টজনদের ঠিকানা। নৈশভোজের পর আরজ জব্বারকে বলেন, শোন, আমাদের বাড়িতে যেহেতু গোয়েন্দাগিরি চলছে, তাই আমরা এবং আশ্রয়প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা- উভয়ই এখন প্রচন্ড ঝুঁকির মধ্যে! তাই বলে আমাদের কাজ বন্ধ রাখলে চলবে না। এখন থেকে কেউ আশ্রয় খুঁজলে- আমি তাদেরকে জয়নাল, আমোদালী, আবুল মেম্বার, সাবেদ মোড়ল, আশুবাবু, ফজলু তালুকদার এবং তোর বাড়ির ঠিকানা দেবো। কারণ, তোমরা সকলেই আশ্রয়প্রার্থীদেরকে নিশ্চিত সহযোগিতা করবে।
- প্রফেসর, তোমার বিশ্বাসের কেউই অমর্যাদা করবেনা। তুমি ভাবীর চিঠির উত্তর লিখে রাখো। আমি সকালের ট্রেনেই রওনা দেবো।
আরজ প্যাডটি নিয়ে লিখতে শুরু করেন-
শ্রদ্ধেয়া ভাবী,
আসসালামু আলাইকুম! বিভীষিকাময় দুঃসময়ে আমাদের আরেকটি বাবার জন্ম হওয়ায় আমি খুবই আনন্দিত। পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত, কলেজ ত্যাগ করা শিক্ষকদের পক্ষে অসম্ভব। নাহলে আমি জব্বারের সাথেই চলে আসতাম। মা এবং ভাইকেও বিষয়টি বুঝিয়ে বলবেন। আমি আপনাদেরকে নিয়ে ভীষণ চিন্তিত! শত্রুরা কখন কী করে বসে- সে দুঃশ্চিন্তা আমার যায়না! ভাইকে বলবেন সাবধানে থাকতে। বিশেষ করে রাতে ওনাকে অন্য বাড়িতে ঘুমাতে বলবেন। লোকজন পাঠানোর ব্যাপারে আমাকে সতর্ক করার জন্যে আপনাকে অজস্র ধন্যবাদ। আমাদের বাড়ির বিকল্প হিসেবে জব্বারকে কিছু পরামর্শ দিয়ে দিয়েছি। আশাকরি আর কোন সমস্যা হবেনা।
ভাবী, আপনাদের নবাগত সন্তানের নাম- ভাই ‘নূরুল ইসলাম’ রেখেছেন, তা খুবই সুন্দর। আগের নামগুলোর সাথে এটির চমত্কার মিল! আবার, এটাও সত্যি বলেছেন যে, আমি বাড়িতে থাকলে এ নামটিই অন্যরকম হতে পারতো। ধন্যবাদ জানাচ্ছি- এবারও আমাকে একটি নাম রাখার দায়িত্ব দেয়ার জন্যে। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রে, বাঙালির চরম দুঃসময়ে, যে নামটি রাখা যুক্তিযুক্ত, তার কারণ সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করছি-
পাকিস্তান শাসনামলের শুরু থেকে শেষাবধি যে রাজনীতিবিদ বাঙালির মনের কথাটি সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করতে পেরেছেন- তিনি হচ্ছেন জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাঙালির দুর্দিনের কান্ডারি, পথের দিশা, শান্তি, প্রগতি ও মুক্তির অগ্রদূত। তিনি ধাপে ধাপে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনে, চৌষট্টির সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে, চেষট্টির ছয়দফা প্রনয়ণে, ঊনসত্তুরের গণ-অভ্যুত্থানে, সত্তুরের নির্বাচনের মহাবিজয়ে এবং মার্চে মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনায় এবং স্বাধীন ‘বাংলাদেশ’ রাষ্ট্রের ঘোষনায়- যে সাহসিকতা, বিচক্ষণতা, অবিচলতা, অসাম্প্রদায়িকতা, ন্যায়পরায়ণতা, আপোসহীনতা, আত্মত্যাগ, অধিকারবোধ ও জাতীয়তাবোধের জন্ম দিয়ে সাত কোটি বাঙালিকে যেভাবে জাগিয়ে তুলেছেন- বিশ্বে তা নজীরবিহীন!
সমকালীন রাজনীতিকদের চিন্তার বিরুদ্ধ স্রোতে থেকেই- তিনি স্বপ্ন দেখেছেন বাংলাদেশের। তিনি আপামর মানুষের প্রিয়নেতা। বাঙালির মুক্তির জন্যে যিনি জীবন-যৌবনের মূল্যবান একযুগ কাটিয়ে দিয়েছেন কারাগারের প্রকোষ্টে। তিনি রাজনীতির কবি। যার ডাকে স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তির জন্যে- যুদ্ধ করি লাখে লাখে!
রাজনীতি যার কাছে ‘বাঙালি’ আর ‘বাংলাদেশ’, দর্শন যার বিশ্বজনীন নৈতিকতা আর মানবতা, হৃদয় যার কুসুম-কোমল, চেহারা যার দীপ্তিময়, ভালবাসায় যিনি অকপট, ভাষণে যিনি যাদুকর, তিনি আমাদের জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান!
তিনি এখনো অজানা কারাগারের প্রকোষ্টে। জীবন তাঁর অনিশ্চিত! তাঁর আদর্শ, চেতনা, আর শুভ নাম ধরে রাখতে হবে বাংলার ঘরে ঘরে। এক মুজিবকে ওরা কারাগারে পুড়েছে, কিন্তু লক্ষ মুজিব আজ বাংলার ঘরে ঘরে। ‘মুজিব’ এক অবিনাশী নাম! তাই, আমি বাংলাদেশে জন্ম নেয়া- এই সন্তানের নাম রাখলাম ‘মুজিব’। এরাই যুগে যুগে বাঁচিয়ে রাখবে বঙ্গবন্ধুকে, বাংলাদেশকে।
আশাকরি নামটি শুনে খুশী হবেন। এই নাম রাখার বিষয়টি সবাইকে বুঝিয়ে বলবেন। তাতেই আমার চিন্তা-ভাবনা সার্থকতা পাবে। আপনাদের সকলের মঙ্গল কামনা করে ও দোয়া চেয়ে ইতি টানলাম। জয় বাংলা!
সালামের সংগে,
আরজ আলী
২১/৭/১৯৭১
ডিএসএস/
