শুক্রবার, ৪ এপ্রিল ২০২৫ | ২১ চৈত্র ১৪৩১
Dhaka Prokash

স্বাধীনতার মহাকাব্য

সাতই মার্চ বাঙালি জাতির জীবনে শ্রেষ্ঠ দিন। প্রতিবছর ৭ মার্চ যখন ফিরে আসে আমাদের হৃদয়ে অনেক কথা ভেসে ওঠে। এই দিনটির জন্যই বঙ্গবন্ধু জীবনভর সংগ্রাম করেছেন। দীর্ঘ ১৩টি বছর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি উপলব্ধি করেছেন, ‘এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয় নাই। একদিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালিদের হতে হবে।’ সেই লক্ষ্যে পৌঁছার জন্যই এত আন্দোলন, এত সংগ্রাম। যার একটি চূড়ান্ত পর্যায় ১৯৭১-এর ৭ মার্চ। ভাবতে কত ভালো লাগে, ২০১৮-এর ৩০ অক্টোবর ইউনাইটেড নেশন এডুকেশন, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন (ইউনেস্কো) ’৭১-এর ৭ মার্চে প্রদত্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের (ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টারি হেরিটেজ) অংশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। যা সমগ্র জাতির জন্য গৌরবের এবং আনন্দের।

’৭১-এর পহেলা মার্চ ইয়াহিয়া খান যখন একতরফাভাবে তেসরা মার্চের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য মুলতবি করলেন, সেদিন ঢাকার রাজপথে মানুষ নেমে এসেছিল। হোটেল পূর্বাণীতে আমাদের পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক চলছিল। জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে আমিও সেই বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে উপস্থিত ছিলাম। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের সমন্বয়ে এই পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক চলছিল। ঠিক ওই সময়েই আকস্মিকভাবে ইয়াহিয়া খানের বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ ঘোষণায় হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে এসে হোটেল পূর্বাণীর চারপাশে জমায়েত হয়। পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক থেকে বেরিয়ে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু ইংরেজিতে বলেছিলেন, ‘দিস টাইম নাথিং উইল গো আন-চ্যালেঞ্জ।’ অর্থাৎ আমি কোনো কিছুই বিনা প্রতিবাদে যেতে দেব না। তখন দেশি-বিদেশি সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিল, ‘আপনি কি স্বাধীনতার কথা বলছেন?’ তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘নট ইয়েট’, অর্থাৎ এখনই নয়। মানুষ বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ধরল তার বক্তৃতা শোনার জন্য। তিনি বক্তৃতা না দিয়ে আমাদের পল্টন ময়দানে পাঠালেন। বিশেষ করে আমার নাম ধরে বললেন, ‘তোফায়েল যাবে, সেখানে আমার পক্ষ থেকে কথা বলবে।’

ইতিমধ্যে প্রিয় নেতার বক্তৃতা শুনতে পল্টন ময়দানে লক্ষ লক্ষ মানুষ সমবেত হয়েছে। পল্টনে গিয়ে আমরা বক্তৃতা করেছি। পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে দিয়ে আমাদের আজকের এই স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়েছি এবং স্লোগান তুলেছি, ‘জাগো জাগো বাঙ্গালি জাগো’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’, ‘বীর বাঙ্গালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ ‘পাঞ্জাব না বাংলা, বাংলা বাংলা’, ‘পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’, ‘আমার নেতা তোমার নেতা, শেখ মুজিব শেখ মুজিব’। পল্টনে সমবেত সংগ্রামী জনতার উদ্দেশে বক্তৃতায় সেদিন বলেছিলাম, ‘আর ৬ দফা ও ১১ দফা নয়। এবার বাংলার মানুষ ১ দফার সংগ্রাম শুরু করবে। আর এই ১ দফা হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আজ আমরাও শপথ নিলাম বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ সুশৃঙ্খল সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।’

সারা বাংলাদেশের মানুষ তখন রাজপথে। বঙ্গবন্ধু সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী মার্চের ২ ও ৩ তারিখ দুপুর ২টা পর্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়। ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু ছাত্র নেতৃবৃন্দকে ডেকে ‘স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনের নির্দেশ দেন। নেতার নির্দেশে ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ-সর্বজনাব নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আসম আব্দুর রব, আব্দুল কুদ্দুস মাখন-ছাত্রলীগ ও ডাকসুর সমন্বয়ে ‘স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করেন। মার্চের ৩ তারিখ পল্টন ময়দানে ‘স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’-এর জনসভায় ‘স্বাধীন বাংলার ইশতেহার’ পাঠ করা হয়। ইশতেহারে বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ‘সর্বাধিনায়ক’, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটিকে জাতীয় সংগীত ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলার মানচিত্রখচিত জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সেদিন আমিসহ স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করি।

তারপর এলো ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। এই ৭ মার্চের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। ঢাকা সিটি আওয়ামী লীগের নেতা গাজী গোলাম মোস্তফা, মণি ভাই, সিরাজ ভাই, রাজ্জাক ভাই, আমি এবং স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ আমরা এই সভা সংগঠিত করার জন্য সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করি। সাতই মার্চ সকাল থেকেই রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনস্রোত আসতে থাকে। তখন মানুষের মুখে মুখে স্বাধীনতা। একটি ঘটনা আমার মনে পড়ে। সেদিন দুপুর একটা। আমি এবং আমারই আরেক প্রিয় নেতা-নামোল্লেখ করলাম না-আমরা দু’জন বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু আমাদের দু’জনের কাঁধে হাত রেখে কথা বলছিলেন। আমাদের সেই নেতা যখন বঙ্গবন্ধুকে বললেন, তিনি তাকে ‘লিডার’ বলে সম্বোধন করতেন-‘লিডার, আজকে কিন্তু পরিপূর্ণ স্বাধীনতার ঘোষণা ছাড়া মানুষ মানবে না।’ আমাদের কাঁধে রাখা হাত নামিয়ে তার নামোচ্চারণ করে বঙ্গবন্ধু ইংরেজিতে বললেন, ‘আই অ্যাম দি লিডার অব দি পিপল। আই উইল লিড দেম। দে উইল নট লিড মি। গো অ্যান্ড ডু ইউর ডিউটি।’ এই বলে তিনি আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উপরে চলে গেলেন।

আমরা ধানমন্ডি থেকে রওয়ানা করি পৌনে তিনটায়। রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছাই সোয়া তিনটায়। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা আরম্ভ করেন সাড়ে তিনটায়। দশ লক্ষাধিক লোকের গগনবিদারী স্লোগানে মুখরিত রেসকোর্স ময়দান। আমি নিজেও স্লোগান দিয়েছি। সেদিনের সভামঞ্চে সৌভাগ্য হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নাম ঘোষণা করার। ’৬৯-এর তেইশে ফেব্রুয়ারি ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদানের দিন থেকে বহু জনসভাতেই প্রিয নেতার নাম ঘোষণার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সাতই মার্চেও বলেছিলাম, ‘এবার বক্তৃতা করবেন প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’ সেদিনের সভামঞ্চে জাতীয় চার নেতাসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা দেওয়ার জন্য দাঁড়ালেন, চারদিকে তাকালেন। মাউথপিসের সামনে পোডিয়ামের উপর চশমাটি রাখলেন। হৃদয়ের গভীরতা থেকে-যা তিনি বিশ্বাস করতেন, যার জন্য তিনি সারাটা জীবন সংগ্রাম করেছেন, ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছেন, সেই বিশ্বাসী আত্মা দিয়ে, বাংলার মানুষকে তিনি ডাক দিলেন, ‘ভাইয়েরা আমার’। তারপর একটানা ১৮ মিনিট ধরে বলে গেলেন স্বাধীনতার অমর মহাকাব্য। বক্তৃতায় তিনি মূলত স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। বঙ্গবন্ধুর সামনে ছিল দুটি পথ। এক. স্বাধীনতা ঘোষণা করা। দুই. পাকিস্তান ভাঙার দায়িত্ব না নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত না হয়ে সুচিন্তিত বক্তব্য প্রদান করা। তিনি দুটোই করলেন। বঙ্গবন্ধু জানতেন সেদিনের পরিস্থিতি। যেটা তিনি আমাদের বলেছিলেন। সেনাবাহিনী তখন প্রস্তুত। মাথার উপর বোমারু বিমান এবং হেলিকপ্টার গানশিপ টহল দিচ্ছে। যখনই বঙ্গবন্ধু এই ভাষায় বলবেন যে, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’, তখনই তারা গোলাবর্ষণ শুরু করবে। সেজন্য বঙ্গবন্ধু সবকিছু জেনেই বক্তৃতা করেছেন। এত বিচক্ষণ নেতা ছিলেন যে, সমস্ত ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে সামরিক শাসকের উদ্দেশে চারটি শর্ত আরোপ করলেন ‘মার্শাল ’ল প্রত্যাহার কর, সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরিয়ে নাও, এ কয়দিনে যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে তার বিচারবিভাগীয় তদন্ত কর এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর কর।’ এই চারটি শর্ত আরোপ করে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায় আখ্যায়িত হলেন না। পাকিস্তানিরা তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায় আখ্যায়িত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তিনি ছিলেন সদা সতর্ক এবং সচেতন। অপরদিকে পুরো বক্তৃতাটি জুড়ে ছিল আসন্ন জনযুদ্ধের রণকৌশল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা । সুস্পষ্টভাবেই বলেছেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।’ ‘আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দেবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারি, আদালত-ফৌজদারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।’ ‘তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু, আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারব, আমরা পানিতে মারব।’ ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে’ তোলার আহ্বান জানিয়ে বললেন, ‘সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রীম কোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমি গভর্নমেন্ট দপ্তরগুলো ওয়াপদা কোনোকিছু চলবে না।’ নির্দেশ দিলেন ‘আটাশ তারিখে কর্মচারীরা যেয়ে বেতন নিয়ে আসবেন।’ সরকারী কর্মচারীদের উদ্দেশে বললেন, ‘আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে খাজনা, ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো কেউ দেবে না।’ গরীবের কথা খেয়াল রেখে বলেছেন, ‘গরীবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে’ সেজন্য শিল্প কল-কারখানার মালিকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘এই সাত দিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইরা যোগদান করেছেন প্রত্যেকটা শিল্পর মালিক তাদের বেতন পৌঁছায়া দিবেন।’

জীবনভর লালিত প্রগাঢ় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রেখে বিরোধী রাজনীতিকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজন যদিও সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।’ আর রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায়, প্রত্যেক ইউনিয়নে, প্রত্যেখ সাব-ডিভিশনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত কওে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।’ বক্তৃতা শেষ করেছেন মূলত স্বাধীনতা ঘোষণা করেই। বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতা সংগ্রাম।’ অর্থাৎ সামগ্রিকতায় জাতীয় মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে জনসাধারণ কর্তৃক নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার ভারসাম্যপূর্ণ বক্তৃতা। সেদিনের সেই স্মৃতি মানসপটে ভেসে ওঠে। অভূতপূর্ব দৃশ্য, কল্পনা করা যায় না। এটিই মানুষ প্রত্যাশা করেছিল। একটা কথা আমার বারবার মনে হয়। একজন নেতা কত দূরদর্শী যে, তিনি সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে জানতেন। কোন সময় কোন কথা বলতে হবে এটা তার মতো ভালো জানতেন এমন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষ আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে দেখিনি। আমি লক্ষ্য করেছি, বঙ্গবন্ধু জীবনে কখনো স্ববিরোধী বক্তব্য দেননি।

একটি বক্তব্য দিয়ে পরে সেই বক্তব্য অস্বীকার করা বা বক্তব্যের মধ্যে পরস্পরবিরোধীতা এটি তার কোনোদিন হয়নি। কারণ, যা তিনি বিশ্বাস করেছেন, ভেবেছেন, মনে করেছেন যে এটিই বাস্তবসম্মত, সেটিই তিনি বলেছেন সুচিন্তিতভাবে। আর যা একবার বলেছেন, মৃত্যুর কাছে গিয়েও আপসহীনভাবে সেই কথা তিনি বাস্তবায়ন করেছেন। শ্রদ্ধেয়া বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কাছে শুনেছি, ৬ তারিখ রাতে বঙ্গবন্ধু পায়চারী করেছেন এবং ভেবেছেন কী বলবেন! বঙ্গমাতা বলেছিলেন, ‘তোমার এত চিন্তার কারণ কী? সারা জীবন তুমি একটি লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছো, তোমার জীবনের যৌবন তুমি পাকিস্তানের কারাগারে কাটিয়েছো, ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছ। তুমি যা বিশ্বাস করো, সেই বিশ্বাস থেকেই আগামীকাল বক্তৃতা করবে।’ বঙ্গবন্ধু তার হৃদয়ে ধারিত গভীর বিশ্বাস থেকেই সেদিন বক্তৃতা করেছেন।

আমরা যদি বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের বক্তৃতা বিশ্লেষণ করি তবে দেখব, অলিখিত একটি বক্তৃতা। ভাষণের সময় ১৮ মিনিট। শব্দ সংখ্যা ১৩০৮টি। আব্রাহাম লিংকনের গেটেসবার্গ অ্যাড্রেস-এর শব্দ সংখ্যা ২৭২, সময় ৩ মিনিটের কম এবং লিখিত। অপরদিকে, মার্টিন লুথার কিং-এর ‘আই হ্যাভে এ ড্রিম’ ভাষণটির সময় ১৭ মিনিট, শব্দ সংখ্যা ১৬৬৭। কিন্তু বিশ্বের কোনো নেতার ভাষণ এমন সংগ্রামমুখর ১০ লক্ষাধিক মুক্তিকামী নিরস্ত্র মানুষের সামনে হয়নি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণটি প্রদান করে মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে, নিরস্ত্র বাঙালিকে সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত করে মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা দিলেন। কী বিচক্ষণ একজন নেতা! আইএসআই সাতই মার্চ ঢাকা ক্লাবের সামনে ছিল। তারা অপেক্ষা করেছিল-যে ঘোষণাটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে বলেছিলেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’-তারা মনে করেছিল সেই কথাটি তিনি সাতই মার্চ বলবেন। আমি আগেই বলেছি বঙ্গবন্ধু ছিলেন সতর্ক। তিনি সবই বলেছেন, কিন্তু শত্রুর ফাঁদে পা দেননি। উল্টো শত্রুকেই ফাঁদে ফেলেছেন। যার জন্য পরদিন আইএসআই রিপোর্ট করলো ‘চতুর শেখ মুজিব চতুরতার সঙ্গে বক্তৃতা করে গেল। একদিকে স্বাধীনতা ঘোষণা করল, আরেকদিকে ৪টি শর্ত আরোপ করে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায় আখ্যায়িত হলো না এবং পাকিস্তান ভাঙার দায়িত্ব নিল না। আমাদের নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। আমরা যে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলাম সেটা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো।’

এই ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। একটি বক্তৃতার মধ্য দিয়ে তিনি একটি জাতি-রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছেন। একটি বক্তৃতার মধ্য দিয়ে তিনি নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র বাঙালি জাতিতে রূপান্তরিত করেছেন। এই একটি বক্তৃতার মধ্য দিয়ে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষকে তিনি স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে একই মোহনায় দাঁড় করিয়েছেন। সাতই মার্চের বক্তৃতার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী নয় মাস জনযুদ্ধ ও গেরিলাযুদ্ধের পথ অনুসরণ করে ৩০ লক্ষাধিক প্রাণ আর ২ লক্ষাধিক মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা মহত্তর বিজয় অর্জন করেছি। সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ আমাদের জাতীয় চেতনার ভিত্তি হয়ে আজ পবিত্র সংবিধানের অংশ।

লেখক: আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা, সংসদ সদস্য, সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

 

Header Ad
Header Ad

যৌথবাহিনীর অভিযান: ৭ দিনে গ্রেপ্তার ৩৪১

ফাইল ছবি

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর অভিযানে গত ৭ দিনে ঢাকাসহ সারাদেশে ৩৪১ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী, কিশোর গ্যাং সদস্য ও মাদক ব্যবসায়ী রয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) রাতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, গত ২৭ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে দেশব্যাপী অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় একাধিক মামলার আসামি, সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীসহ ৩৪১ জন অপরাধীকে।

আইএসপিআর আরও জানায়, গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে ১৫টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৩টি গোলাবারুদ, মাদকদ্রব্য, দেশীয় অস্ত্র, চোরাই মোবাইল ফোন, সিম কার্ড, জাল নোট এবং নগদ অর্থ উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

এছাড়া, ঈদুল ফিতরের জন্য যাত্রীদের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী গণপরিবহন টার্মিনাল ও স্টেশনগুলোতে টহল, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং কালোবাজারি রোধে কাজ করেছে। মহাসড়কে বিকল্প রুট, পার্কিং ব্যবস্থা এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যা ঈদের যাত্রাকে সহজ ও নিরাপদ করে তুলেছে।

এছাড়া, শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ নিশ্চিত করে শান্তিপূর্ণ ঈদ উদযাপনের ব্যবস্থা করেছে সেনাবাহিনী। চুরি, ছিনতাই, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ এবং অসামাজিক কর্মকাণ্ড রোধে রোবাস্ট টহল, চেকপোস্ট এবং বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে।

আইএসপিআর জনগণকে অনুরোধ করেছে, যেকোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপের বিষয়ে কাছের সেনা ক্যাম্পে তথ্য দেওয়ার জন্য।

Header Ad
Header Ad

রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় প্রাণ গেলো নারীর

প্রতীকী ছবি

রাজধানীর মুগদা মানিকনগর এলাকায় রাস্তা পারাপারের সময় অটোরিকশার ধাক্কায় সুমি আক্তার (২৫) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) দিবাগত রাত সাড়ে ৯টার দিকে মুগদা মানিকনগর ওয়াসা রোডে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত সোয়া ১টার দিকে মৃত ঘোষণা করেন।

ওই নারীকে হাসপাতালে নিয়ে আসা প্রতিবেশী মেজবা বলেন, সুমি বিভিন্ন বাসায় টিউশনি করাতেন। গতরাত সাড়ে ৯টার দিকে মানিকনগর ওয়াসা রোড এলাকায় রাস্তা পারাপারের সময় দ্রুতগামী একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ধাক্কা দেয় তাকে।এতে গুরুতর আহত হলে প্রথমে তাকে উদ্ধার করে মুগদা হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

তিনি আরও বলেন, তার বাসা মানিকনগর ওয়াসা রোড এলাকায়। বাসা নম্বর ৯৮/সি/১। বাবার নাম সাজু মিয়া। স্বামী মাহফুজুর রহমানের সঙ্গে থাকতেন তিনি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ ফারুক মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মরদেহ মর্গে রাখা হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানায় জানানো হয়েছে।

Header Ad
Header Ad

ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে পর্যটকের ঢল, হোটেলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ

ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে পর্যটকের ঢল। ছবি: সংগৃহীত

ঈদুল ফিতরের ছুটিতে কক্সবাজারে পর্যটকদের ব্যাপক আগমন ঘটেছে। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে সকাল থেকে পর্যটকদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে, আর বিশেষ করে সমুদ্রসৈকত এবং জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্রগুলো ছিল পূর্ণ। ৯ দিনের ঈদের ছুটিতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের সংখ্যা বিপুল পরিমাণে বাড়ায়, কক্সবাজারে পর্যটকদের ভিড় ১০ তারিখ পর্যন্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে পর্যটকদের এই ব্যাপক আগমনকে কাজে লাগিয়ে কিছু মৌসুমী ব্যবসায়ী, মধ্যস্বত্বভোগী এবং অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে। হোটেল, গেস্ট হাউস, রেস্তরাঁ এবং যানবাহনের খরচ বেড়ে যাওয়ার অভিযোগের শিকার হচ্ছেন পর্যটকরা।

ঢাকা থেকে কক্সবাজারে আসা শাহাদাত হোসেন জানান, তিনি কলাতলীর সী মুন হোটেলে নন এসি রুমের জন্য প্রতি রাতের ৬ হাজার টাকা ভাড়া চাওয়ার অভিযোগ করেন। একইভাবে, সুগন্ধা পয়েন্টের লাইট হাউস কটেজে এক রাতের জন্য ৭ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছে, যা রুমের মানের তুলনায় অস্বাভাবিক মনে হয়েছে সাবিনা আক্তারের কাছে।

এছাড়া রাজশাহী থেকে আসা সোলেমান জানান, বাস থেকে নামার পর এক অটোচালক তাকে এক হোটেলে নিয়ে যায়, যেখানে এসি রুমের ভাড়া ৮ হাজার টাকা চাওয়া হয়। তবে, তিনি সাড়ে ৬ হাজার টাকায় রুমটি নিতে রাজি হন।

এ বিষয়ে মেরিন ড্রাইভ হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে বিপুল সংখ্যক পর্যটক আসায় এই সুযোগে কিছু মৌসুমী ব্যবসায়ী এবং অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। তিনি জানান, বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে এবং এ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।

টুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পর্যটক হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং হেল্প ডেস্কে অভিযোগ জানালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Header Ad
Header Ad

সর্বশেষ সংবাদ

যৌথবাহিনীর অভিযান: ৭ দিনে গ্রেপ্তার ৩৪১
রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় প্রাণ গেলো নারীর
ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে পর্যটকের ঢল, হোটেলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ
ব্যাংককে ড. মুহাম্মদ ইউনূস-নরেন্দ্র মোদির বৈঠক আজ
রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়া ময়মনসিংহের ইয়াসিন নিহত
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক ইস্যুর ইতিবাচক সমাধান হবে: প্রধান উপদেষ্টা
অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণে ঠাকুরগাঁওয়ে প্রশাসন, পুলিশ ও বিআরটিএ'র বিশেষ অভিযান
শুল্ক আরোপের জেরে বিশ্ববাজারে মার্কিন ডলারের দরপতন
ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের উন্নতি, শীর্ষেই আর্জেন্টিনা
পাহাড়ের প্রধান সমস্যা চাঁদাবাজি: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক তানিফা
বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দিতে ব্যাংকক পৌঁছালেন প্রধান উপদেষ্টা
বঙ্গোপসাগরে দীর্ঘতম উপকূলরেখা ভারতের দাবি জয়শঙ্করের
ট্রাম্পের নতুন শুল্ক পরিকল্পনার ঘোষণার পরপরই স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি
গাজীপুরে চলন্ত ট্রেনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, ঢাকা-ময়মনসিংহ রেল যোগাযোগ বন্ধ
সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ভারতীয় যুবকের মৃত্যু
গাজার অংশবিশেষ দখল করার ঘোষণা ইসরায়েলের
মিঠাপুকুরে শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে কিশোর গ্রেফতার
এসএসসি পরীক্ষা একমাস পেছানোর দাবিতে শিক্ষার্থীদের অসহযোগ আন্দোলনের ডাক
অ্যাটলেটিকোকে হারিয়ে ফাইনালে রিয়ালের মুখোমুখি বার্সেলোনা