এলেঙ্গা-রংপুর মহাসড়ক ৪ লেন প্রকল্পে নানা অনিয়ম

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) আর্থিক সহযোগিতায় সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) করা হয়েছে। তার ভিত্তিতে বিস্তারিত নকশাও করা হয়েছে। কিন্তু সঠিকভাবে প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়নি। এ জন্য বারবার ডিজাইন পরিবর্তন করতে হয়েছে। বাস্তব কর্মপরিকল্পনা না করেই কাজ করা হচ্ছে। সরকারের আদেশ ছাড়াই বিদেশে স্টাডি ট্যুর করা হয়েছে।
‘এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক ৪ লেনে উন্নীতকরণ’ প্রকল্পের এই চিত্র উঠে এসেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে। চলমান প্রকল্পের উপর অগ্রাধিকারভিত্তিতে সরকার এই নিবিড় পরিবীক্ষণ করছে।
উল্লেখ্য, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের আওতায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এ প্রকল্পের অবস্থান হচ্ছে টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা ও রংপুর জেলা।
এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে এবং ব্যবসা-বাণ্যিজ বৃদ্ধিসহ নিরাপদ ও দ্রুত সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনে সরকার প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় ছয় বছর আগে।
আইএমইডির পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সড়কটি যথেষ্ট মজবুতভাবে নির্মাণ করা হলেও ওভারলোডিং নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অল্প সময়ে তা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সড়কের স্থায়িত্বের জন্য ওভারলোডিং নিয়ন্ত্রণ স্টেশন স্থাপনসহ শক্ত নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে।
১৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কের জন্য ১১ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সরকার প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। প্রকল্পের কাজ সম্পন্নের মেয়াদ ছিল ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের আগষ্ট পর্যন্ত। কিন্তু ২০২২ সালের জুন মাস শেষ হয়ে গেলেও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। দীর্ঘ এই সময়ে অর্থাৎ গত এপ্রিল পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৩৬ শতাংশ। আর প্রকল্পের সামগ্রিক কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৪৫ শতাংশ।
বরং সংশোধন করে সময় বাড়ানো হয়েছে তিন বছরেরও বেশি। একই সঙ্গে বেড়েছে ব্যয়ও। সংশোধিত সময় অনুযায়ী কাজ শেষ হবে ২০২৪ সালে। ইতোমধ্যে সংশোধিত প্রকল্পটি সরকার অনুমোদন দিয়েছে। শতাংশের হিসাবে প্রকল্পের সময় বেড়েছে ৬৭ শতাংশ।
সময় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের খরচও বেড়েছে চার হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। এখন প্রকল্পের মোট খরচের পরিমান দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। অর্থাৎ শতাংশের হিসাবে খরচ বেড়েছে ৪০ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ।
প্রকল্পের প্রধান কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ৩২টি ব্রিজ নির্মাণ, তিন হাজার ৯০ মিটার ফ্লাইওভার নির্মাণ, দুটি রেলওয়ে ওভারপাস নির্মাণ, কালভার্ট ১৮০টি, ৩৯টি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে। এছাড়া পথশিশুদের জন্য নির্মাণ করা হবে ১১টি ওভারপাস। প্রকল্পের একটি বড় কাজ হচ্ছে হাটিকুমরুলে ১৫০০ মিটার দীর্ঘ একটি ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণ করা।
এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে ৩২৬ হেক্টর। এরমধ্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে ২২০ হেক্টর। এই ভূমি অধিগ্রহণে জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা করা হচ্ছে না। এরফলে ক্ষতিগ্রস্তরা ঠিকমতো ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে না।
কাজ শেষ করা হবে ১১টি প্যাকেজে। এরমধ্যে ১০টি প্যাকেজের কাজ চলমান। একটি প্যাকেজের কাজ প্রক্রিয়াধীন। তবে এসব প্যাকেজের দরপত্র ডিপিপি অনুযায়ী হয়নি।
সূত্র জানায়, সরকার থেকে বলা হচ্ছে প্রকল্প পরিচালক যাতে পরিবর্তন করা না হয়। কিন্তু এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে না। ২০১৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের ১৯ মে পর্যন্ত এ প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী শাহরিয়ার হোসেন। এরপর নতুন করে প্রকল্প পরিচালক করা হয় ড. মো. ওয়ালিউর রহমানকে।
প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন ও দিক নির্দেশনার জন্য প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি (পিএস্ই), প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ও প্রকিউরমেন্ট কমিটি করা হয়েছে। তিন মাস পরপর পিএসই ও পিআইসি কমিটির বৈঠক করার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। শুরু থেকে এ পর্যন্ত মাত্র দুটি পিএসই ও একটি পিআইসি বৈঠক হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এখনো অডিট কমিটির আপত্তি শেষ হয়নি। ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত ১২টি অডিট আপত্তির মধ্যে ৭টি নিস্পন্ন হয়েছে। এখনো নিস্পত্তির বাকি ৫টি। এরমধ্যে রয়েছে সরকারের আদেশ (গভমেন্ট অর্ডার) ছাড়াই ৭৩ লাখ টাকা ব্যয় করে ইউএসএ স্টাডি ট্যুর (শিক্ষা সফর)। এছাড়া করসালটেন্টের সঙ্গে চুক্তি বর্হভূত অতিরিক্ত ১৩ লাখ টাকা ঠিকাদারকে প্রদানসহ আরও কয়েকটি অডিট আপত্তি রয়েছে।
আইএমইডির পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে- বিভিন্ন প্যাকেজের আওতায় ঠিকাদারের কর্মপরিকল্পনা সুনির্দিষ্টভাবে অনুসরণ না করা মালামাল সংগ্রহে পরিকল্পনার অভাব ও নির্মাণ কাজে ধীরগতি। এই সড়কে প্রতিনিয়ত যানবাহন চললেও যাত্রীদের জন্য নির্মাণ সময়ে ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। শুধু তাই নয়, যানবাহনের ওজন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না রেখে বিভিন্ন স্থানে অসমাপ্ত রোড সেকশন জরুরি অবস্থায় যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। সড়কটির দৈর্ঘ ১৯০ কিলোমিটার হলেও যথেষ্ট ফুটওভার ব্রিজের ব্যবস্থা করা হয়নি। এরফলে দুর্ঘটনার বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
তবে প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় একটি এক্সিট প্ল্যান করা হয়েছে। তাতে ঠিকাদার কোম্পানি নির্মাণকাজ শেষে আরও সাত বছর নিয়োজিত থাকবে এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করবে।
আইএমইডির পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন সম্পর্ক জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মো. ওয়ালিউর রহমান ঢাকাপ্রকাশ’কে বলেন, ‘এ পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৫২ শতাংশ। ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। আশা করছি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থাৎ ২০২৪ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। তবে হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জ এর কাজ করতে তিন বছর লাগবে।
ফিজিবিলিটি স্টাডির ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘এডিবি ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ফিজিবিলিটি স্টাডি করেছে। করোনাসহ বিভিন্ন কারণে আগে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে। কারণ ২০১৪ সালের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ এক অবস্থানে নেই। সড়কের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তাই অনেক কিছু পরিবর্তন করতে হয়েছে। সংযোজন করতে হয়েছে। প্রায় সব ফিজিবিলিটি স্টাডিই পরিবর্তন হয়ে থাকে।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে এই অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বলেন, ‘সরকারের নির্দেশ বা আদেশ ছাড়া কেউ দেশ ছাড়তে পারে না। আর বিদেশ ভ্রমণ করতে হলে তো আরও আদেশ লাগে। ওই শিক্ষা সফরে তখনকার সচিবসহ অনেকেই গিয়েছিলেন। অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রায় সবগুলোরই উত্তর দেওয়া হয়েছে। সিস্টেমের কারণে কিছু ব্যাপারে নিস্পত্তি হয়নি, তবে তা প্রক্রিয়াধীন। আমি দায়িত্ব নিয়ে সুষ্ঠভাবে কাজ বাস্তবায়নের স্বার্থে সময় সুযোগ করে সবই করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
জেডএ/আরএ/
