চিড়াও সিন্ডিকেটে! বাজার থেকে উধাও, দাম চড়া

হঠাৎ করেই অস্থির চিড়ার বাজার। চিড়া পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতি কেজি ৪০ টাকার চিড়া ৬০ টাকায়ও পাওয়া যাচ্ছে না। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বেশি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বাজার থেকেই চিড়া উধাও হয়ে গেছে। মিলমালিকরা বেশি দামে বাজারে চিড়া সরবরাহ করলেও মেমো দিচ্ছেন না।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, মিলমালিকদের সিন্ডিকেটের কারণেই বাজারে চিড়ার সংকট তৈরি হয়েছে। বলা যায় উধাও হয়ে গেছে। তিন দিন আগেও প্রতি কেজি চিড়া বিক্রি হয়েছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা। কিন্তু গত দুই দিন ধরে সেই চিড়াই বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৭০ টাকা।
মিলমালিকরা বলছেন চিড়া নেই। খুচরা বিক্রেতারাও বলছেন চিড়া নেই। তাদের অভিযোগ, মিল থেকে চিড়া দিচ্ছে না। আবার দিলেও বেশি দাম নিচ্ছে। অনেক মিল মেমোও দিচ্ছে না। ইচ্ছা মতো দাম নিচ্ছে। সরবরাহ না থাকায় দাম বাড়ছে।
চিড়ার বাজার পরিস্থিতি জানতে বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ একাধিক বাজার ঘুরে পাওয়া গেছে এই চিত্র।
এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় তলিয়ে আছে সিলেট ও সুনামগঞ্জ। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে হবিগঞ্জ,মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, কুড়্রিগাম, রংপুর, গাইবান্ধা, নিলফামারী, জামালপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা। বন্যকবলিত এসব এলাকায় ব্যাপকভাবে শুকনো খাবার বিতরণ করছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলগুলো। এই শুকনো খাবারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যাচ্ছে চিড়া। এ কারণেই হঠাৎ করে চিড়ার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফা লুটে নিচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুন) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে গিয়ে দেখা গেছে চিড়ার বাজার ব্যাপক গরম। যার কাছ থেকে বেশি দাম পাচ্ছে ব্যবসায়ীরা তার কাছে চিড়া বিক্রি করেছে। হঠাৎ চিড়ার বাজার অস্থির কেন জানতে চাইলে কারওয়ান বাজারের বাসার ট্রেডার্সের রুবেল ঢাকাপ্রকাশ-কে বলেন, ‘বাজারে চিড়া নেই। কিনতে চাইলে রাতে পাবেন। মিল থেকে আসা মাত্র বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। তিন দিনের ব্যবধানে ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়ে গেছে।’
দাম বেশির ব্যাপারে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কেজিতে ২ টাকা লাভ করে বিক্রি করছি। কয়দিন আগে ৪৫ টাকা কিনে ৪৭ টাকা বিক্রি করেছি। ৫২ টাকা সর্বোচ্চ। এখন কোনো চিড়া নেই। ২১ জুন ৫৩ টাকা কিনে ৫৫ টাকা বিক্রি করেছি। বৃহস্পতিবার ৫৮ টাকা কেজি কিনে ৬০ টাকা বিক্রি করা হচ্ছে। ৬০ থেকে ৬২ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘মাল এনেই বিক্রি করা হয়। চালান দেখেন মিল থেকে সিন্ডিকেট হচ্ছে। মেমোতে দাম লিখছে না। ইচ্ছা মতো দাম নিচ্ছে। তাদের দাঁত ভাঙা জবাব দিতে হবে। তবেই কমবে দাম।’
বাসার ট্রেডার্ থেকে বের হয়ে একটু দূরের দোকানে যেতেই দেখা গেল, সেই চিড়া ৭০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। চিড়ার দাম কতো জানতে চাইলে মেসার্স রফিক ট্রেডার্সের জসিম ঢাকাপ্রকাশ-কে বলেন, ‘৭০ টাকা কেজি। ৬০ টাকা কেজি চিড়া নেই। আগে বেচা হতো । এখন নেই। টঙ্গী থেকে দিনেরটা দিনে চিড়া এনে বিক্রি করা হচ্ছে। চাহিদা বেশি। তাই চিড়া নেই। মিল থেকে আসলে পরে পাওয়া যাবে।’
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্টের চিড়া ব্যবসায়ীরাও বলছেন, বস্তা ধরে নিলে মিল থেকে অর্ডার নেওয়া হবে। মিল মালিকরা দাম বেশি নেওয়ায় আমরাও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। সিটি এন্টারপাইজের লিটন বলেন, ‘৬০ থেকে ৭০ টাকা্ কেজি বিক্রি করা হচ্ছে। ডেলিরটা ডেলি (দিনের টা দিনে) কিছু লাভ করে বিক্রি করা হচ্ছে। বন্যার কারণে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মিলমালিকরাও দাম বাড়াচ্ছে।’
জানা গেছে, হঠাৎ করে মিল থেকে চিড়ার দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এ জন্য বাজারেও বেশি দাম। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চিড়ার দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়েছেন মিল মালিকরা।
খুচরা বিক্রেতারা জানান, গত তিন-চার দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি চিড়ায় সর্বোচ্চ ১৫ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছে টঙ্গীর মিতালী চিড়া কল, সাভারের মাসকুলার ফুডসহ বিভিন্ন চিড়া কলের মালিকরা। তারা বেশি দাম নেওয়ায় মেমোতে দামও উল্লেখ করছে না। এই সিন্ডেকেটের কারণে বাজারে চিড়ার দাম হঠাৎ করে বাড়ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মিতালী চিড়া কলের মালিক জসিম ঢাকাপ্রকাশ-কে বলেন, ‘ মাল নেই। পরশু পাওয়া যাবে।’
কেন দেরি জানতে চাইলে বলেন, অনেক চাহিদা। আগে থেকে অর্ডার আছে। তাদের আগে দিতে হবে। আজকে ২৭০০ টাকা বস্তা। কয়েকদিন আগে ২৫০০ টাকা বস্তা বিক্রি করেছি। রশিদে (মেমো) বিক্রির দাম উল্লেখ নাই কেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি পুলিশ হেড কোয়াটার, ক্যান্টমেন্টে মাল দিই কারো কাছে রশিদে দাম লেখা লাগে না। আর আপনি দামের কথা কন?’
মাসকুলার ফুডস-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়, ৫০ কেজির বস্তা তিন হাজার টাকা। হঠাৎ বেশি দাম কেন জানতে চাইলে বলেন,‘মাল নেই, বলে সাফ জানিয়ে দেন। বলেন, আমরা কী করব। চাহিদা বেশি। তাই দিতে পারব না’
চিড়ার বাজার অস্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান ঢাকাপ্রকাশ-কে বলেন, ‘অস্বাভাবিক দামে চিড়া বিক্রি করার তথ্য পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে তারা (বুধবার থেকে) অভিযান শুরু করেছেন। তারা তিনটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করেছেন। আরও অভিযান শুরু করা হবে। যারাই আইন ভঙ্গ করে ব্যবসা করে কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ ভোক্তা অধিদপ্তর সব সময় ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে।’
জেডএ/এনএইচবি/এমএমএ/
