‘তুলিতে আঁকা ভালোবাসা’

ফোনটা বেজে উঠল, রিসিভ করলাম। ওপার থেকে ভেসে এল নারী কণ্ঠ- হ্যালো আবির সাহেব বলছিলেন?
- জ্বি বলুন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ওপাশ থেকে ভেসে এল- আমার মেয়েটা অ্যাক্সিডেন্ট করছে, হাসপাতালে ভর্তি আছে। এক ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন কিন্তু কোথাও পাচ্ছি না। একজন আপনার নম্বর দিয়ে বলল, আপনার গ্রুপ নাকি ও নেগেটিভ। যদি একটু দয়া করতেন! খুব ইমারজেন্সি!
- অবশ্যই! আমি এখনি আসছি।
ঠিকানাটি নিয়ে তড়িঘড়ি রিকশায় উঠে পড়লাম আর ভাবতে লাগলাম, কণ্ঠটা খুবই পরিচিত, চিরচেনা, ভালোবাসা আর মাধূর্যে ভরা আমার প্রিয়তমা সুমনার হবহু নকল। আমি ভাবতেই লাগলাম হঠাৎ রিকশাওয়ালা বলল, মামা চলে এসেছি।
- ও আচ্ছা, বলেই ভাড়া মিটিয়ে তড়িঘড়ি হাসপাতালে ঢুকে ফোন দিলাম।
চিরচেনা কণ্ঠধারিণী যখন আমার সামনে এসে দাঁড়াল, আমি বাকরুদ্ধ হয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলাম। সেই কণ্ঠধারিণী আর কেউ নয়; আমার হারিয়ে যাওয়া সুমনা। কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। দুজনই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। হঠাৎ নার্স এসে সুমনাকে বলল, জলদি করুন ম্যাডাম!
আমি ঘোর কেটে এগিয়ে এসে বললাম- কী হয়েছে সুমনা?
ও শাড়ির আঁচল মুখে গুঁজে কাঁদতে শুরু করল। সুমনার কান্না আমার হৃদয়কে আবারও ভেদ করল। ওর চোখের জল আমি কোনোদিনই সহ্য করতে পারিনি। যখন আমাদের প্রেমের বিচ্ছেদ ঘটে, ওই সময়ে সুমনার অঝোর কান্না আজো আমার হৃদয়কে বিদীর্ণ করে।
নিজেকে প্রস্তুত করে বললাম- ‘শান্ত হও সুমনা, ইনশাআল্লাহ কিচ্ছু হবে না। আমি তো আছি।‘
ও আমার দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইল, ঠিক যেদিন ওকে বলেছিলাম- আমি তোমারই আছি, ছিলাম, থাকব। সেই প্রতিশ্রুতি যেন আবার এল ফিরে। রক্ত ম্যাচিং হলো, বেডে শুয়ে পড়লাম। পাশের বেডেই শুয়ে ছিল সুমনার ছোট্ট মিষ্টি মেয়ে, একদম সুমনার মতো হয়েছে দেখতে। গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে জখম হয়েছিল।
হঠাৎ সুমনা আমাকে বলল, তোমার পাশে একটু বসতে পারি। আমি প্রতিদিন যাকে ভেবে তুলিতে আঁকি ভালোবাসা, সেই মানুষটি আমার পাশে বসবে ভাবতেই পুলকিত হলাম। তাকে বললাম, চাইলেই বসতে পার। সুমনা পাশে বসল। আমি চোখ বন্ধ করে ফিরে গেলাম আমার হারানো ভালোবাসার রাজ্যে। যেখানে আমরা দুজন হাতে হাত রেখে পথ চলেছি, সবুজ ঘাসে শুয়ে সুমনার কোলে মাথা রেখেছি, নৌকাতে পাশাপাশি বসে প্রকৃতির সৌন্দর্য লুটে নিয়েছি। কতদিন, কত বছর দুজন জনাকে আঁকড়ে ছিলাম। একজন আরেকজনকে দেখতে না পেলে অস্থির হয়ে উঠতাম। সুমনা আমাকে আদর করে তার নামের সাথে মিলিয়ে সুমন বলে ডাকত। মাঝে মাঝে রসিকতা করে বলত- "আমরা দুজন সুমন-সুমনা, পাগল আর পাগলী।"
সুমনার বাবা আমাকে মোটেও পছন্দ করতেন না। একে তো বেকার ছিলাম, দ্বিতীয়ত আমার আর্থিক অবস্থাযও ভাল ছিল না। টিউশনির টাকা আর মাঝে মাঝে সুমনার জোর করে গুজে দেওয়া কিছু উপঢৌকন দিয়ে বেশ ভালোভাবেই চলতাম। আমাদের রিলেশনটি ছিল ওপেন সিক্রেট তাই সুমনার বাবা সুমনাকে নজরদারিতে রাখত। তার বাবার পছন্দের ছেলের সাথে বিয়েতে রাজি না হওয়ায় সুমনাকে তার বাবা বেদম মারধরও করেছিলেন। শেষমেষ উনি আমার পেছনে লোক লাগালেন। একদিন পুলিশ এসে আমাকে ধরে নিয়ে গেল। আমার অপরাধ আমি নাকি অবৈধ ড্রাগসের ব্যবসা করি। মিথ্যা মামলায় আমাকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হলো। আমার মা ও সুমনা হাতজোড় করে অনুরোধ করেছিল যেন মামলা উঠিয়ে নেন। সুমনার বাবা শর্ত দিয়েছিল দুটি, সুমনাকে ভুলে যেতে হবে এবং সুমনাকে তার বাবার পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করতে হবে। আর কোনো উপায় না দেখে তারা রাজি হয়ে গেল। আমি মানতে চাইনি কিন্তু মায়ের দেওয়া কসম আর সুমনার চোখের জলে ভেসে যাওয়া অনুরোধ ফেলতে পারিনি। সুমনার সেই চোখের জল আমার হৃদয় নদীতে আজো বহমান। প্রতি দিবসে তার ভালোবাসা একে যাই হৃদয়ের রংতুলিতে...
মাঈন উদ্দীন, কুষ্টিয়া।
এসএন
