জীবন যাপনে আয় কমেছে, বেড়েছে ব্যয়

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি–বাংলাদেশের জন্য সমস্যাটি নতুন কিছু নয়। অনেকদিন থেকেই দেশে এই সমস্যা বিদ্যমান। বর্তমানে করোনা মহামারিতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ক্রমবর্ধমান। যেহেতু চাল-চিনিসহ বেশ কিছু খাদ্যদ্রব্য আমাদের বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। যদিও আমরা নিজেদের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলে দাবি করে থাকি। করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারের দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধি এর বড় কারণ।
বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের চড়ামুল্য দিয়ে খাদ্য সামগ্রী আমদানি করতে হচ্ছে। কাজেই বাজারেও তার প্রভাব পড়ছে স্বাভাবিকভাবেই। এতে নিম্নআয়ের মানুষের জীবন যাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে ক্রমশই। নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুর দাম ক্রমাগত বাড়ছে অস্বীকার করার উপায় নেই। আমাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়েছে। বেতন বৃদ্ধি পেয়েছে, মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে আয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে অতিদারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি কমেছে এমন বিভিন্ন দেশের যে তালিকা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক, সে তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই। তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের নাম থাকলেও বাংলাদেশের নাম নেই। ওই দেশগুলিতে যে গতিতে দারিদ্র্য কমেছে, বাংলাদেশে কমেছে এর চেয়ে কম গতিতে। নিম্নআয়ের মানুষ যা আয় করছে, তার পুরোটাই জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ইত্যাদির জন্য ব্যয় করার মতো অর্থ তাদের হাতে থাকছে না।
অন্যদিকে আয় যে হারে বেড়েছে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য। কারণ একটাই, তা হচ্ছে বাজারের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সব থেকে বেশি কষ্টকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন নিম্নবিত্ত, অবসরপ্রাপ্ত সৎ সরকারি কর্মচারী, প্রবীণ জনগোষ্ঠী ও নিম্নআয়ের মানুষ। বেশি কষ্টকর পরিস্থিতিতে রয়েছেন অধিকাংশ প্রবীণ। চাকরিজীবী সৎভাবে চাকরিজীবন কাটিয়েছেন, তাদের অবস্থা আরও শোচনীয়। করোনা পরিস্থিতিতে কাজ কমেছে ফলে আয়ও কমেছে। জীবন যাপনের মানে এসেছে গতিহীনতা।
এদিকে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে বিভিন্ন অজুহাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে বিপাকে ফেলছে। একবার যে পণ্যের দাম বাড়ে, তা আর কমে না। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা এ ব্যাপারে কাজ করলেও তা তেমন কার্যকর ভূমিকা না রাখায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আসছে না। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) নামে একটি সংস্থা রয়েছে; কিন্তু তাদের কার্যক্রমও তেমন লক্ষণীয় নয়।
আমি মনে করি,সাধারণ মানুষের নিত্যকার দুর্ভোগ এড়াতে সরকারের অনেক বেশি দায়ত্বশীল ভুমিকা পালন করতে হবে। তাদের অনেক দায়িত্ব আছে। গঠনমুলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দরকার আছে। বেশি পরিমাণে নজরদারি বাড়াতে হবে দুর্নীতি কমাতে হলে। কারণ দুর্নীতি না কমলে, সঠিকভাবে আইনের প্রয়োগ বাস্তবায়ন না হলে সমস্যার সমাধান হবে না। অপরাধী চক্র বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতেই থাকবে। ফলে সমস্যা বাড়তেই থাকবে। বাজার অস্থিতিশীল থাকবে। জনপ্রশাসনেরও সমস্যা নিরসনে আরও বেশি উদ্যোগী ভুমিকা পালন করতে হবে। এককভাবে এই সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়। কাজেই আমি মনে করি, সরকারকে এ বিষয়ে ভাবতে হবে এবং যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
এসএ/
