রঙ রূপের দইগোটা

ঢাকার কোনও পার্কে বেড়াতে গেলে গাছটি আপনার দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারে।কারণ চোখে পড়ার মতো তেমন আকর্ষণীয় কিছুই থাকে না প্রায় সারাবছর।
শুধুমাত্র চিরুনির ফলার মতো লালচে রঙের খোলসঅলা কতগুলো ফল থাকে গাছে। তাও আবার উপাদেয় কোনও ফল নয় বলে মানুষের উৎসাহ খানিকটা কম। সবকিছু মিলিয়ে কিছুটা অবহেলিতই বলা যায়। তবে বর্ষার শেষভাগ থেকে হেমন্ত পর্যন্ত ঈষৎ গোলাপি রঙের ফুলগুলো ফুটতে থাকে। শরৎ কিংবা হেমন্তের রৌদ্রজ্জ্বল দিনে আলো ঝলমল নীলাকাশের পটভূমিতে এ ফুল আপনার মন কাড়বে নিশ্চয়। তখন গাছে দুএক থোকা ফলও থাকে।
গাছটির সঠিক পরিচয় অনেকেরই অজানা। কেউ কেউ জাফরান বলেও ভুল করেন। আদতে জাফরান বেশ দুষ্প্রাপ্য এবং নামিদামি সুগন্ধি। গাছ বর্ষজীবী ও পিঁয়াজকন্দীয়। জন্মে শীতের দেশে। জানামতে আমাদের দেশে জাফরান চাষ হয় না। তা ছাড়া আকার আকৃতিতেও গাছ দুটি একেবারেই আলাদা। আলোচ্য গাছটি মূলত লটকন বা দইগোটা (ইরীধ ড়ৎবষষধহধ) নামেই বেশি পরিচিত। তবে দেশি ফল লটকা বা লটকনের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। আমাদের দেশে এগাছের আরেকটি পরিচয় হচ্ছে এরা রঞ্জক উদ্ভিদ। ধারণা করা হয় বীজের রঙ দই রাঙানোর কাজে বেশি ব্যবহৃত হতো বলেই এমন নামকরণ। প্রাচীনকালে মানুষ যে কয়েকটি গাছ থেকে প্রাকৃতিক রং সংগ্রহ করত দইগোটা তারমধ্যে অন্যতম। রঞ্জক উদ্ভিদ সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে গিয়েই প্রথম এগাছ সম্পর্কে জানতে পারি। বর্তমানে সীমিত পরিসরে প্রাকৃতিক এই রঙ ব্যক্তি উদ্যোগে বাজারজাত করা হচ্ছে। আরো ব্যাপকভাবে উৎপাদন করা সম্ভব হলে কৃত্রিম রঙ ব্যবহারের ঝুঁকি অনেকটাই কমবে।
ঢাকায় রমনা পার্ক, বলধা গার্ডেন ও বোটানিক্যাল গার্ডেনসহ কারও কারও ব্যক্তিগত সংগ্রহেও দেখা যায়। প্রাকৃতিকভাবে বান্দরানের লামায় দুর্গম পাহাড়েও জন্মাতে দেখেছি। এরা ক্রান্তীয় আমেরিকার প্রজাতি। সতের’শ শতাব্দীর দিকে স্প্যানিশদের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। গাছ ছোট, ঝোপাল, ৪ থেকে ৫ মিটার উঁচু ও চিরসবুজ। পাতা বড়, ১০ থেকে ১৮ সেমি লম্বা, গোড়া তাম্বুলাকার, বোঁটা ৫ থেকে ৭ সেমি লম্বা। প্রস্ফুটনকাল শরৎ থেকে শীতের প্রথমভাগ অবধি। ফুল প্রায় ১০ সেমি দীর্ঘ মঞ্জরিদণ্ড গুচ্ছবদ্ধ থাকে, প্রত্যেকটি ৫ সেমি চওড়া, একসঙ্গে অল্প কয়েকটি ফোটে। দেখতে গোলাপি, ঈষৎ বেগুনি বা সাদাটে। পাপড়ির মাঝখানে হলুদ-সোনালি রঙের একগুচ্ছ পুংকেশর থাকে। ফল ৩ থেকে ৫ সেমি চওড়া, লালচে বাদামি, নরম কাঁটায়ভরা। বীজ ৩ সেমি চওড়া, লাল শাঁসে জড়ান। এ বীজ থেকেই পাওয়া যায় প্রাকৃতিক রং। কৃত্রিম রঙের পরিবর্তে প্রাকৃতিক রঙটাই আবার ফিরে আসুক। অন্তত খাদ্য সামগ্রীতে ব্যবহারের ক্ষেত্রে। প্রকৃতিই আমাদের মনের ভাষা বোঝে এবং প্রকৃতিই আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু।
লেখক: প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ক লেখক, সাধারণ সম্পাদক তরুপল্লব
