ইভিএম ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) পরীক্ষা করতে চার সদস্যের কারিগরি দল নিয়ে যাওয়ার জন্য ৩৯টি রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। কিন্তু দুই দিনে যেসব রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনে গিয়েছে তাদের কেউই কারিগরি দল নিয়ে যায়নি। বরং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিরা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে ইভিএম ইস্যুতে দরকষাকষি করেছেন।
বেশিরভাগ দলই বলেছে, তারা ইভিএম চায় না। দেশের মানুষ এখনও ইভিএম এর বিষয়ে অভ্যস্ত হয়ে উঠেনি। তারা সরাসরি ব্যালটে সিল দিয়ে ভোটের পক্ষে নিজেদের মতামত তুলে ধরেছে। তবে কয়েকটি দল ইভিএম এর পক্ষে তাদের মত তুলে ধরেছে।
আর নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইভিএম বিষয় না। আগে নির্বাচন কমিশনকে আস্থা অর্জন করতে হবে। ইভিএমের সুফল ভালোভাবে তুলে ধরতে ইসির সক্ষমতা দেখাতে হবে। রাজনৈতিক দল ও জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারলেই সংকট অনেকটা কেটে যাবে।
অবশ্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল বলছেন, নির্বাচন কমিশনের দিক থেকে শতভাগ নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা হবে। তবে রাজনৈতিক দলগুলো ঘরে বসে থাকলে হবে না। তাদেরও মাঠে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
গত ১৯ জুন ১৩টি দলকে কমিশন কার্যালয়ে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ইসি। ওই দিন গণফোরাম, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি অংশ নেয়নি। জাতীয় পার্টিসহ (জাপা) অন্যদলগুলো অংশ নিলেও তারা কেউ কারিগরি বিশেষজ্ঞ আনেনি।
২১ জুন দ্বিতীয় ধাপের সংলাপে অংশ গ্রহণ করে ৮টি দল। এদিনও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিসহ ৫টি দল সংলাপ বর্জন করে। অপর চারটি দল হচ্ছে- জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল।
দুই দিনে ২৬টি দলের মধ্যে বিএনপিসহ ৮টি দল ইসির ডাকে সাড়া দেয়নি। শেষ ধাপে ২৮ জুন নির্বাচন কমিশনে যাওয়ার কথা রয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ ১৩টি দলের।
প্রথম দুই ধাপের আলোচনায় যারা অংশ নিয়েছেন তাদের মতামত হচ্ছে ইভিএম এখনও ভোটারদের কাছে জনপ্রিয় যন্ত্র না। ইভিএমকে আস্থায় নিতে পারছেন না তারা।
ইসির আমন্ত্রণে প্রথম দিনে নিজেদের মতামত তুলে ধরে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু ইভিএম সম্পর্কে বলেন, ‘আমরা ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে ভোট নেওয়ার পক্ষে নয়। কারণ, দেশের মানুষ এখনও ইভিএমে ভোট দেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। দেশের মানুষ এখনও ইভিএম বিশ্বাস করে না। গ্রাম-গঞ্জের মানুষ এখনও মনে করেন ইভিএম মানেই কারসাজি। কেউ কেউ মনে করেন, কোনো একটি দলের স্বার্থে ইভিএমে ভোট গ্রহণ করা হয়।’
তবে সরাসরি ইভিএম এর পক্ষে-বিপক্ষে না বলে জাতীয় পার্টি (জেপি) সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘সংলাপে ইভিএম এর গুণাগুণ সম্পর্কে বলা হচ্ছে। তার আগে চিন্তা করতে হবে আমরা কি একসঙ্গে ৩০০ আসনে ইভিএম দিয়ে নির্বাচন করতে সক্ষম? যদি তাই না পারি তাহলে কিছু কেন্দ্রে বা কিছু আসনে ইভিএম আর কিছু কেন্দ্রে ব্যালটে ভোট এটা হলে বিভেদ সৃষ্টি করা হলো। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য কমিশনাররা যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন কিন্তু বলেছেন রাগ-অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী হয়ে কিছু করব না। এভাবে কিছু আসনে ইভিএম করা হলে তাদের সেই শপথ ভঙ্গ হবে।’
প্রথম দিন সংলাপে যাওয়ার কথা থাকলেও নিজেদের ব্যস্ততার কারণে যায়নি গণফোরাম (ড. কামাল) অংশের নেতারা। তবে তারা নির্ধারিত তারিখে না গেলেও যেতে আগ্রহী বলে জানান দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক আহমেদ। তিনি ঢাকাপ্রকাশ-কে বলেন, ‘আমাদের দলের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান নিজ নির্বাচনি এলাকায় বন্যার কারণে ব্যস্ত থাকায় যেতে পারিনি। তবে ইসিকে বলেছি আমাদের পরবর্তী তারিখে ডাকার জন্য। তবে যাই আর না যাই আমরা ইভিএম এ বিশ্বাস করি না। ইভিএম এর খেলা কুমিল্লায় দেখিয়ে দিয়েছে। ইভিএম এর চাইতে নির্বাচনি ব্যবস্থায় আগে আস্থা ফেরাতে হবে।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট (বিএনএফ) চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘সমস্যা ইভিএমএ না, সমস্যা হচ্ছে ভোট যখন দেওয়া হয় বাটন চাপার সময় ওখানে ডাকাত থাকে। তাদের সরাবেন কীভাবে? এটা বড় সমস্যা। ইভিএম বড় সমস্যা না। তা ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থার সংকটের সুরাহা যদি না হয় তাহলে ইভিএমের ত্রুটি-বিচ্যুতি খুঁজে লাভ নেই। আমরা সবাই মিলে নির্বাচনে যে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছি, এটা আগে ঠিক করতে হবে।’
সংলাপ বর্জন করে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহিম ঢাকাপ্রকাশ-কে বলেন, আমরা ইভিএম এর পক্ষে না। আমাদের এক দাবি নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা। এ নির্বাচন কমিশনের উপর আমাদের কোনো আস্থা নেই। সেখানে ইভিএম হোক আর যাই হোক আমরা সেটার পক্ষে না।
ব্যালট পেপারে কি নির্বাচন সুষ্ঠু করা সম্ভব এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, ইভিএম এর চাইতে কিছুটা স্বস্তিদায়ক। ইভিএম এর চেয়ে ব্যালট গ্রহণযোগ্য।
অবশ্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, আমরা আমাদের দিক থেকে শতভাগ নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করব। আামার মনে হয় না সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে কেউ ওই কাজটা (কারচুপি) করতে যাবে। অন্য কোনোভাবে সম্ভব কি-না, তবে আমরা যারা কমিশনের সদস্য আছি, সরকারও চাইবে না আমরা আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করি।
তিনি বলেন, কেবল তাদের উপর নির্ভর করলে নির্বাচন সুন্দর হবে না। এজন্য দলগুলোকে ঘরে বসে না থেকে মাঠে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
ইভিএম সম্পর্কে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ব্রতীর প্রধান নির্বাহী শারমিন মুরশিদ ঢাকাপ্রকাশ-কে বলেন, ‘আস্থা একটা যন্ত্রের প্রতি নাও থাকতে পারে। কিন্তু আস্থা তৈরি করার দায়িত্ব তাদের যারা নির্বাচন পরিচালনা করবে। আস্থা তৈরি করতে হবে। এটা ব্যবহার করার মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে এটা কার্যকরি এবং নিরাপদ পাশাপাশি আমার ভোটের অধিকারটা অক্ষুণ্ণ রাখছে। এটা যথেষ্টভাবে ব্যবহার হয়নি। যেটুক হয়েছে তার ভেতর যে ত্রুটি দেখতে পেয়েছি তাতে মানুষের মনের ভেতরে আস্থা আনেনি এটা। ইভিএম এখন পর্যন্ত আস্থার যথেষ্ট প্রমাণ রাখেনি। একটা স্বচ্ছতার ঘাটতি থেকে যায়।’
তিনি বলেন, ‘মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি আস্থাশীল না হলে ইভিএম আর আস্থা শূন্য হয়ে যাবে। এটার ট্রায়াল টেস্ট করার যে সময় প্রয়োজন সেরকম যথেষ্ট সময় হাতে নেই। যদি কোনো বিষয় জটিল ও অসচ্ছতার বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে তাহলে আমার প্রস্তাব প্রথাগত ভোটিংয়ে নির্বাচনটা করা।’
এসএম/এনএইচবি/এসএন
