জাল স্ট্যাম্পের ছড়াছড়ি
বছরে ৩০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের ২১টি মামলার নথির জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প (যা ‘কোর্ট ফি’ নামে পরিচিত) পরীক্ষা করা হয়েছিল গত ১৯ মে। এরমধ্যে ২০টিতেই জাল স্ট্যাম্প ধরা পড়ে। অর্থাৎ শতকরা হিসেবে ৯৫ ভাগ জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পই জাল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় সুপ্রিম কোর্ট এই পরীক্ষা চালায়। তবে জেলা পর্যায়ের আদালতগুলোতে জাল স্ট্যাম্পের উপর পরীক্ষা না হওয়ায় জেলা পর্যায়ের কোনো চিত্র পাওয়া যায়নি।
এর আগে গত এপ্রিল মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক বৈঠকে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচটি মামলায় ব্যবহৃত জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প বা কোর্ট ফি পরীক্ষা করে সবকটিই জাল প্রমাণিত হয় বলে জানা গেছে।
সুপ্রিম কোর্ট ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত মে এবং এপ্রিল মাসে জাল স্ট্যাম্প পরীক্ষা করলেও বছর তিনেক আগে হাইকোর্ট বিভাগের বর্তমান রেজিস্ট্রার মো. গোলাম রব্বানীর নজরে আসে জুডিশিয়াল জাল স্ট্যাম্প ব্যবহারের বিষয়টি। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে এ বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে নিম্ন আদালত পর্যন্ত বিচারিক সব পর্যায়ে জুডিশিয়াল জাল স্ট্যাম্পের এমন যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে সরকার প্রতি বছর প্রায় ৩০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
স্বাভাবিক সময়ে সারাদেশে বছরে প্রায় ১৬ লাখ মামলা দায়ের হয়। মামলাপ্রতি ২০০ টাকার স্ট্যাম্প হিসাব করে এরমধ্যে ৯৫ শতাংশ স্ট্যাম্প জাল ধরলে বছরে ৩০ কোটি টাকার একটা পরিসংখ্যান পাওয়া যায়।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে, অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন গত মঙ্গলবার (২১ জুন) ঢাকাপ্রকাশ’কে বলেন, সুপ্রিম কোর্টে স্ট্যাম্প এখন মেশিনে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় যে কয়েকজন ধরা পড়েছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলা এখন বিচারাধীন। মামলা করেছে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষ। আর পুরো বিষয়টি দেখছেও সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষ। এ সব বিষয় তিনি সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র ও আপিল বিভাগের রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ সাইফুর রহমান ঢাকাপ্রকাশ’কে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে এখন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প পরীক্ষার ইলেক্ট্রনিক যন্ত্র (মেশিন) সরবরাহ করা হয়েছে। অতিদ্রুত দেশের সব জজ কোর্টেই এই যন্ত্র সরবরাহ করা হবে।
সর্বশেষ গত মাসে ৯৫ শতাংশ জাল কোর্ট ফি শনাক্ত হওয়ার পর প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতির সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি বিশেষজ্ঞ দলের মাধ্যমে আদালত অঙ্গনে অভিযান চালায় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। অভিযানে জাল জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
যেসব স্ট্যাম্প বিচারিক কাজে ব্যবহৃত হয়, সেগুলোকে জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প বা কোর্ট ফি বলা হয়। এগুলো আকারে ছোট হয়। নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের তুলনায় জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প কম টাকারও হয়ে থাকে। সাধারণত জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প দুই, চার, পাঁচ, ১০ ও ২০ টাকার হয়ে থাকে। রাজস্বের অন্যতম উৎস স্ট্যাম্প (জুডিশিয়াল ও নন জুডিশিয়াল) তৈরির আইনগত অধিকার রয়েছে শুধু বিজি প্রেস এবং সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রিন্টিং প্রেসের। তবে অসাধু চক্র বিভিন্ন ছাপাখানা থেকে এ সব জাল স্ট্যাম্প তৈরি করে বাজারে ছেড়ে থাকে।
প্রসঙ্গত, সুপ্রিম কোর্টের উভয় (আপিল ও হাইকোর্ট) বিভাগ মিলে প্রতিদিন হাজারখানেক মামলা দায়ের হয়ে থাকে। এ সব মামলা দায়ের থেকে শুরু করে রায় ও আদেশের কপি সরবরাহ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ব্যবহার করা হয়। একইভাবে অধস্তন আদালতেও বিচারিক বিভিন্ন পর্যায়ে জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ব্যবহার করা হয়।
জানা গেছে, করোনার মধ্যেও গতবছর ২০২১ সালে সারাদেশে প্রায় ১৩ লাখ মামলা দায়ের হয় বলে। বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার প্রথম বছর ২০২০ সালে সারাদেশে মামলা দায়ের হয় প্রায় ১১ লাখ। তবে দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার আগের বছর অর্থাৎ স্বাভাবিক সময়ে ২০১৯ সালে সারাদেশের সব আদালত মিলে মামলা দায়ের হয়েছিল প্রায় ১৬ লাখ।
মামলাগুলোর প্রতিটিতে দেড়শ-দুইশ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ব্যবহৃত হয়। যেহেতু বছরের পর বছর ধরে এভাবে জাল স্ট্যাম্প ব্যবহৃত হয়ে আসছে। স্বাভাবিক বছরের মামলাগুলোতে ২০০ টাকা করে স্ট্যাম্পের হিসাব করলে দেখা যায়, শুধুমাত্র ২০১৬ সালে এক বছরেই জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প বিক্রি করে রাষ্ট্রের আয় হওয়ার কথা ছিল ৩২ কোটি টাকা। আর ৯৫ শতাংশ জাল স্ট্যাম্প হিসাব করলে এই ৩২ কোটি টাকার মধ্যে ৩০ কোটি টাকারই রাজস্ব হারিয়েছে সরকার।
এনএইচবি/আরএ/
