৭৩ বছরেও উজ্জীবিত আওয়ামী লীগ

উপমহাদেশের পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ হচ্ছে অন্যতম। উপমহাদেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ১৩৭ বছরের ভারতের কংগ্রেস এখন চরম কঠিন সময় পার করছে। মুসলিম লীগের অস্তিত্ব বিলীন। কিন্তু ৭৩ বছরে পা রাখা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এখন পুরো মাত্রায় উজ্জীবিত। উপমহাদেশের পুরনো এই রাজনৈতিক দল ৭২ বছর পেরিয়ে আজ ২৩ জুন পা রাখছে ৭৩তম বছরে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতেও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তির কাছে দেশের অন্য সকল রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড প্রায় ম্লান। তেজদীপ্ত আওয়ামী লীগের ধারে কাছেও নেই অন্য কোনো রাজনৈতিক দলগুলো।
টানা তিন মেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকায় দেশের উন্নয়নের পাশাপাশি দলকেও সুসংগঠিত করেছে আওয়ামী লীগ। দলটির সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দলের সিনিয়র নেতারা মনে করেন আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ থাকলে এমন কোনো শক্তি নাই তাদের পরাজিত করতে পারে।
বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডটি অর্জিত হয়েছে যে দলটির নেতৃত্বে সেই দল এখনো সগৌরবে মাথা উঁচু করে টিকে আছে। তবে এই অবস্থায় আসতে বহু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। অনেক নেতাকর্মীর প্রাণ দিতে হয়েছে। একটি দলের আদর্শ ধরে রাখতে এত বেশি প্রাণ দেওয়ার ঘটনা ইতিহাসে বিরল।
মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে ঢাকার কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে দলটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পরবর্তী কালে নাম ছিল ‘নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’। ১৯৭০ সাল থেকে দলটির নির্বাচনী প্রতীক নৌকা। ১৯৫৫ সালে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আদর্শের অধিকতর প্রতিফলন ঘটানোর জন্য এর নাম করা হয় ‘আওয়ামী লীগ’।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বাঙালি জাতির ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধসহ সকল গণতান্ত্রিক এবং সাধারণ মানুষের ভাত ও ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দানের গৌরব অর্জন করেছে। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও সাধারণ সম্পাদক সামসুল হক।
দেশের বড় বড় অর্জনের পেছনে আওয়ামী লীগের অবদান রয়েছে। সেটা ক্রীড়া ক্ষেত্রে হোক, জাতীয় ইস্যুতে হোক। আওয়ামী লীগ সরকারের আন্তরিক উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় মহান ২১ ফেব্রুয়ারি মর্যাদা লাভ করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের। ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কারও মধ্যস্থতা ছাড়াই স্বাক্ষরিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল টেস্ট ক্রিকেটের মর্যাদা লাভ করে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই।
এ ছাড়া দেশের আত্মমর্যাদার প্রতীক সক্ষমতার প্রতীক বহুল কাঙ্ক্ষিত পদ্মা সেতুর ভিত্তি প্রস্তর উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তার নেতৃত্বেই পদ্মা সেতুর দ্বার উন্মোচিত হবে ২৫ শে জুন। এ ছাড়া চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্ণফুলি টানেল নির্মাণও আওয়ামী লীগের হাত ধরে। রয়েছে ঢাকাবাসীর স্বপ্নের প্রকল্প মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, সমুদ্রসীমা অর্জন। তা ছাড়া ঢাকার চারদিকে ঘিরে চক্রাকার ট্রেন সার্ভিস চালুরও পরিকল্পনা করেছে আওয়ামী লীগ। পার্শ্ববর্তী বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে ছিটমহল বিনিময়ও হয় আওয়ামী লীগের আমলে।
দেশের অন্য যেসকল রাজনৈতিক দল রয়েছে বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি, জাতীয় পার্টি। এই দুই দলই ক্ষমতার মসনদে বসেছে। তবে তাদের জন্ম ইতিহাস নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। দল দুটির প্রতিষ্ঠাত ছিলেন সেনা কর্মকর্তা। সরকারি একটি সংস্থার দায়িত্বে থাকার পর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করার মধ্য দিয়ে দল গঠন করেন। যা নিয়ে রয়েছে নানা সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক।
আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন, এখনো জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে আওয়ামী লীগ এগিয়ে। ভোটের হার বিশ্লেষণ করলেও আওয়ামী লীগ অন্যান্য দল থেকে এগিয়ে। নির্বাচন কমিশন থেকে বিগত তিনটি নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায় অন্যান্য দল থেকে আওয়ামী লীগ এগিয়ে রয়েছে।
নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভোট পায় ৪৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ, অপরদিকে বিএনপি পায় ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ। আর জাতীয় পার্টির ভোটের হার ছিল ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ। দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটের হার ছিল ৭২ দশমিক ১৪ শতাংশ। জাতীয় পার্টির প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৭ শতাংশ, ওয়ার্কার্স পার্টির ভোটের হার ছিল ২ দশমিক ১০ শতাংশ। একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভোট পেয়েছিল ৭৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ, বিএনপি ১২ দশমিক ৩৩ শতাংশ, জাতীয় পার্টি এরশাদ ৫ দশমিক ০৭ শতাংশ আর স্বতন্ত্র পেয়েছে ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ।
দেশের রাজনৈতিক দলের দূরবস্থার কথা তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমাদের প্রতিপক্ষ যে কয়টা দল আছে তাদের জন্মস্থানটা কোথায়? যদি ধরেন মূল একটি দল আছে বিএনপি। বিএনপি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে একজন মিলিটারি ডিকটেটরের হাতে। জাতীয় পার্টি সেটাও ওইভাবেই তৈরি। আরেক মিলিটারি ডিকটেটর সেও ক্ষমতায় বসে জাতীয় পার্টি করেছে। যে দলগুলো তৃণমূল থেকে উঠে আসেনি সেই দলগুলোর কাছে কি আশা করেন?
মাঠে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল না থাকায় এর আগেও আক্ষেপ করেছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘বাম দলগুলো ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র হতে হতে বাম হয়ে কখনো ডানে কাত হয়, কখনো বামে কাত হয়, তাদের তো এই অবস্থা। তাহলে মাঠে আছে কে? একটা ভালো শক্তিশালী দল করে দেন, মাঠে দেখা হবে।’
আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে খুনিচক্র মনে করেছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশের মাটি স্পর্শ করেন। শহীদের রক্তে ভেজা আওয়ামী লীগের পতাকা হাতে তুলে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ তথা অর্থনৈতিক মুক্তির দায়িত্বভার গ্রহণ করে বাংলাদেশকে আজ অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করেছেন।’
এসএম/এনএইচবি/এমএমএ/
