ইদ্রাকপুর দূর্গ
পুকুরের পাড় থেকে দেখা ইদ্রাকপুর দুর্গ
মুন্সীগঞ্জ শহরের মাঝখানেই অবস্থিত ইদ্রাকপুর দূর্গ। আনুমানিক ১৬৬০ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল। এটি নির্মাণ করেছিলেন বঙ্গের তৎকালীন সুবাহদার মীর জুমলা। সে সময়কার বিক্রমপুর, সোনারগাঁও ও ঢাকাকে নদীপথে আসা জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য যে ত্রিভূজাকার রক্ষাব্যূহ তৈরি করা হয়েছিল। এটি ছিল তার প্রথম ও প্রধান দূর্গ। মোঘল আমলে বঙ্গে প্রতিরক্ষা কাজে যতগুলো সামরিক দূর্গ নির্মাণ করা হয়েছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে সুরক্ষিত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দূর্গ ছিল এই ইদ্রাকপুর দূর্গ।
ইদ্রাকপুর দূর্গের গুরুত্ব
অত্যন্ত সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে পূর্ব বঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল) মোঘলদের আগেও সুলতানী আমল থেকেই বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করে। এর কেন্দ্রবিন্দুতে বিক্রমপুর (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ), সোনারগাঁও ও ঢাকা ছিল নানা কারণেই প্রসিদ্ধ। ধান, পাট ছাড়াও মসলিন ছিল বিশেষ রপ্তানি পণ্য। যে কারণে শিক্ষা বা বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এলাকাগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চট্টগ্রাম বা কোলকাতা বন্দর ব্যবহৃত হলেও কেন্দ্রে থাকা এই তিনটি শহর ছিল প্রখ্যাত। যেকোনো নদীর পাড়েই তো গড়ে উঠত বড় শহর। বিক্রমপুর ছিল চারটি নদীর সংযোগস্থলে। কিন্তু এতে বাইরে থেকে আসা ওলন্দাজ বা আরাকান জলদস্যুরা প্রায়ই নদীপথে এসে ঢাকা আক্রমণ করে লুটপাট করা আরম্ভ করে।
দূর্গের ড্রাম আকৃতির মূল কাঠামো
নদীপথ বিশারদ মীর জুমলা বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হবার পর একটি ত্রিভূজাকার রক্ষাব্যূহের পরিকল্পনা করেন। প্রথমেই ব্যূহ নির্মাণ করেন বিক্রমপুরে। মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, ইছামতি ও ধলেশ্বরী- এই চারটি নদীর সঙ্গমস্থান ছিল বিক্রমপুর। কাজেই উত্তর বা দক্ষিণ, যে দিক দিয়েই আক্রমণ আসুক না কেন, প্রথম ও প্রধান বাধা নির্মাণ হলো এখানে। তারপরও যদি সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে শত্রুর নৌকা বহরকে পরাভূত করার জন্য কিছুটা ভাটিতে এসে শীতলক্ষ্যা নদীর পুব পাড়ে সোনাকান্দা ও পশ্চিম পাড়ে হাজীগঞ্জ দূর্গ নির্মাণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, কোনোভাবে ইদ্রাকপুর পার হলেও উপায় ছিল না, নদীর দুই পাড় থেকে উপর্যুপুরি আক্রমণে শত্রুদের সকল নৌকা ডুবিয়ে দেওয়া হতো।
কে ছিলেন মীর জুমলা
ইরানের একটি ধনী তেল ব্যবসায়ী পরিবারে আনুমানিক ১৫৯২ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মীর জুমলা। পড়ালেখা শেষে ঘুরতে ঘুরতে তরুণ বয়সেই বর্তমান হায়দ্রাবাদের অধীন গোলকোন্দা রাজ্যে এক হীরক ব্যবসায়ীর অধীনে তিনি চাকরি নেন। এই এলাকা হীরকের খনি হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল। তিনি ছিলেন শিক্ষিত, সাহসী ও ঝুঁকিগ্রহণে সিদ্ধহস্ত। এই চাকরি নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল, এই বাণিজ্য সম্বন্ধে সম্যক ধারণা নেওয়া। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ব্যবসাটি সম্বন্ধে বেশ ভালো জ্ঞান নিয়ে তিনি নিজেই এই ব্যবসায় নেমে পড়েন। কয়েক বছরের মধ্যেই তার এই বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে করতে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। ভারতবর্ষ ছাড়াও পূর্বদিকে মেলাকা (বর্তমান মালয়শিয়া) বা আচে (বর্তমান ইন্দোনেশিয়া) থেকে আরম্ভ করে শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ পেরিয়ে পশ্চিমে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত তার হীরক বাণিজ্য সম্প্রসারণ করেছিলেন মীর জুমলা। এভাবেই মোঘল সম্রাট পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক হয় তার। তরুণ শাহজাদা আওরঙ্গজেবের সঙ্গেও গড়ে ওঠে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সম্পর্ক।
নদী ও সাগর পথে বাণিজ্য করার জন্য ধীরে ধীরে বিশাল নৌবহর গড়ে তুলেছিলেন মীর জুমলা। কিন্তু এই পথে প্রায়শই তার নৌবহরে আক্রমণ হতো জলদস্যুদের। তাদের মোকাবিলা করার জন্য মীর জুমলা নিজেই এক নৌ-সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। নদীপথে আক্রমণ এড়ানোর জন্য বিকল্প পথ খুঁজতে গিয়ে এই অঞ্চলের সব নদীপথ তার নখদর্পণে চলে আসে। কোন নদীর কোন শাখা কোথায় কার সঙ্গে মিশেছে, বছরের বিভিন্ন সময়ে কোন নদীর নাব্য কতটুকু থাকে, কোন নদীর স্রোতের তোড় কতটুকু, ইত্যাদি সকল তথ্য তার আয়ত্বে চলে আসে। তাই কয়েক বছরের মধ্যে তার সেনাবাহিনী বিশেষ করে নৌবাহিনী সংখ্যায় ও কৌশলে এক বিশাল শক্তিতে পরিণত হয়।
এদিকে সম্রাট শাহজাহানের অসুস্থতার সুযোগে তার চার পুত্রের মধ্যে লেগে গেছে ক্ষমতা দখলের দ্বন্দ্ব। জ্যেষ্ঠপুত্র দারাশিকোকেই সিংহাসনে বসাতে চেয়েছিলেন শাহজাহান। বঙ্গ থেকে দ্বিতীয় পুত্র শাহ সুজা তাকে আক্রমণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে বাংলায় ফিরে আসেন। তৃতীয় পুত্র আওরঙ্গজেব ছোটভাই মুরাদকে সঙ্গে নিয়ে বড়ভাই দারাশিকোকে পরাজিত করেন। দারশিকোকে কারাগারে আবদ্ধ করা হয় এবং এরপর মেরে ফেলা হয়। সুযোগ বুঝে মুরাদকেও কারাগারে বন্দি করেন আওরঙ্গজেব। একচ্ছত্রভাবে মোঘল সম্রাট হিসেবে নিজেকে দাবি করেন। আবার তাকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে শাহ সুজা বঙ্গ থেকে রওনা হন। আওরঙ্গজেব যখন এই সংবাদ পান, তখন মীর জুমলাকে নিয়োগ করেন সেনাপতি হিসেবে সুজার বাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য। শাহ সুজাকে তো বঙ্গ থেকে নদী পথেই এগোতে হবে। আর সব নদীপথ সম্বন্ধে মীর জুমলার জ্ঞান অপরিসীম। তার নৌবাহিনীও ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। যে কারণে শাহ সুজার বাহিনী সহজেই পরাজিত হয়ে ঢাকায় ফিরে আসতে বাধ্য হয়। সংবাদ পেয়ে আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে হুকুম করেন শাহ সুজাকে ঢাকায় গিয়ে পরাজিত করে হত্যা করার। শাহ সুজা খবর পেয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এরপর আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকেই বাংলার সুবাহদার নিযুক্ত করেছিলেন।
ইদ্রাকপুর দূর্গের মূল প্রবেশদ্বার
মীর জুমলা যে কেবল বঙ্গেই সীমাবদ্ধ ছিলেন, তা নয়। ব্রহ্মপুত্র নদী ধরে উত্তরে গিয়ে মেঘালয়, আসাম ও কুচবিহার পর্যন্ত জয় করে মোঘল সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়ে এসেছিলেন। বিভিন্ন গবেষকের মতে, আসাম অভিযানে মীর জুমলার বাহিনীতে ব্যবহৃত হয়েছিল ৩২৩টি যুদ্ধজাহাজ, ১২ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য এবং পদাতিক বাহিনী হিসেবে ৩০ হাজার সৈন্য। আসাম তখন ছিল বিশাল রাজ্য। মহারাজা জয়ধ্বজ সিংহ একেবারে পূর্বে ঘুরগাঁও প্রাসাদ থেকে এটি পরিচালনা করতেন। কামরূপ (বর্তমান গৌহাটি) দখলের জন্য একটি অ্যাডভান্স রেকি টিম পাঠিয়ে মীর জুমলা চলে যান কুচবিহার দখলে। কুচবিহারের রাজা পালিয়ে গেলে সেখানকার প্রশাসনিক দায়িত্ব বুঝে নেন মীর জুমলা। তার খাস লোক সেখানে বসিয়ে এসে দখল করেন কামরূপ। এখানকার রাজাও পালিয়ে বাঁচেন। ক্ষিপ্ত হয়ে মীর জুমলা সিদ্ধান্ত নেন গোটা আসামই দখলে নেবেন। সেজন্য চলে যান পূর্বে।
এর মধ্যে শুরু হয়ে যায় বর্ষাকাল। পাহাড়ি অঞ্চলে ছোট ছোট নদী বা ছড়াগুলিও ফুলে ফেঁপে বিশাল খরস্রোতা নদীতে পরিণত হয়। বিভিন্ন পাহাড় বা টিলাতে আশ্রয় নিতে হয় মীর জুমলার বাহিনীকে। অন্য কোনো বাহিনী হলে হয়তো পিছুটান দিত। কিন্তু মীর জুমলার সাহসী নেতৃত্বে অবস্থান ও মনোবল চাঙ্গা থাকে তার সেনাবাহিনীর। বর্ষা কমে যাওয়ার পর আবার অগ্রসর হলে প্রাণনাশের আশঙ্কায় মহারাজা তার সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তি করেন। চুক্তির শর্তানুসারে গোটা আসাম যে শুধু মোঘল সাম্রাজ্যের আওতায় আসবে সেটিই নয়, প্রত্যেক রাজাকে তাদের একজন করে কন্যাসন্তানকে মোঘল সম্রাটের হেরেমে পাঠাতে হবে! মহারাজা জয়ধ্বজ সিংহের একমাত্র রাজকন্যা রমনী গভরুকেও যেতে হয়। তবে রাজকন্যা হওয়ায় সেখানে তার কোনো অবমাননা হয়নি। তিনি ইসলাম ধর্ম অবলম্বন করার পর রহমত বানু বেগম নাম নেন। সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র মোহাম্মদ আজম শাহ (যিনি হলেন পরবর্তী সম্রাট) তাকে বিয়ে করার কারণে অল্প কয়েক মাসের জন্য তিনি হয়েছিলেন মোঘল সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী।
ইদ্রাকপুর দূর্গের কাঠামো
চারিদিকে চওড়া দেয়ালে পরিবেষ্টিত বিশাল এলাকাজুড়ে নির্মাণ করা হয়েছিল ইদ্রাকপুর দূর্গ। এলাকাটি দৈর্ঘ্যে ৮২ মিটার এবং প্রস্থ্যে ৭২ মিটার। পূর্ব পাশটি চতুর্ভূজাকার আর পশ্চিম পাশটি প্রায় গোলাকার। ইটে গড়া দূর্গটির প্রায় প্রতি কোনায় রয়েছে উঁচু করে গড়া গোলাকার প্ল্যাটফর্ম। প্রতিটির উপরেই বসানো থাকত কামান। পূর্ব পাশটিতে নির্মাণ করা হয়েছিল বিশালাকার একটি ড্রামের মতো অংশ। এর উপরে বসানো ছিল একটি বিশাল কামান। সিঁড়ি দিয়ে এর উপরে উঠা যায়। এটিরও চারিদিকে রয়েছে চওড়া দেয়াল। এর নিচে রয়েছে বেশ কয়েকটি কক্ষ।
উপরে উঠার সিঁড়ি
কোনো দেয়ালেরই উপরিভাগ সমান নয়। পাতা বা খিলানাকারে সম্পূর্ণ দেয়ালটির শোভা বৃদ্ধি করা হয়েছিল। তবে আশ্চর্য বিষয় হলো, প্রতিটি খিলানেই রয়েছে ছিদ্র, শত্রুর উপর গুলি বা তীর বর্ষণের জন্য। সে আমলের বন্দুকে গুলি লোড করার আগে বারুদ ঢুকিয়ে কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে ভালোমতো চেপে বসিয়ে তারপর গুলি হিসেবে একটি লোহার বল ব্যবহার করা হতো। যে কারণে গুলি লোড করতে যেমন সময় নিত, আবার একটির বেশি গুলি একসঙ্গে বেরও হতো না। সে কারণে একটি চমৎকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল এই ইদ্রাকপুর দূর্গে। এই যে দেয়ালে ছিদ্র, এর একটি খুবই চমকপ্রদ ডিজাইন করেছিলেন মীর জুমলা। দূর্গের ভেতর থেকে দেখলে দেখা যাবে একটি বড় চতুষ্কোনাকার ছিদ্র, কিন্তু এটি দেয়ালের ভেতর চারভাগে ভাগ হয়ে গেছে। বাইরে থেকে দেখা যাবে চারটি ছোট চতুষ্কোনাকার ছিদ্র। ভেতরে প্রতি ছিদ্রের পেছনে কয়েকজন করে সৈন্য দাঁড়াত, একজন গুলি করে সরে গেলেই পরেরজন এসে দাঁড়াত, আর প্রথমজন গিয়ে তার বন্দুক আবার লোড করত। একেকজন এসে একই ছিদ্র থেকে এদিক বা ওদিক, যেদিক থেকেই শত্রু আসুক না কেন, তা দেখতে পেত এবং সেদিকে নিশানা করেই গুলি ছুঁড়তে পারত। দূরে থাকা শত্রুর জন্য উপরের সারির দুই ছিদ্র, কাছের শত্রুর জন্য নিচের সারির দুই ছিদ্র, এভাবে শত্রুকে মোকাবিলা করা হতো।
দূর্গের আগাম নিরাপত্তার জন্য মীর জুমলার ছিল ঘাটে সবসময় প্রস্তুত রাখা ২০০টি সামরিক জাহাজ। তার প্রশিক্ষিত নৌ-সেনারা সারাবছর এখানে পালা করে ডিউটি করত। দূর্গের চতুর্দিকে ছিল তার ওয়াচ টাওয়ার। এ ছাড়াও উজানে এবং ভাটিতে কয়েক মাইল এলাকা পর্যন্ত নদীর পাড় ধরে কয়েকটি ছোট ওয়াচ টাওয়ার বানিয়েছিলেন মীর জুমলা। এখানে চব্বিশ ঘণ্টা প্রহরী থাকত, দূর থেকে আসা শত্রু দেখলে দূর্গকে বিউগল বাজিয়ে আগাম সংকেত দেওয়ার জন্য।
মীর জুমলার সামরিক সিদ্ধান্ত ছিল, শত্রুপক্ষ যত বড়ই হোক না কেন, এখানেই তাকে ঘায়েল করতে হবে। যে কারণে কামান, নৌজাহাজ ও সৈন্যসহ সমগ্র শক্তি নিয়ে এখানেই ঝাঁপিয়ে পড়ত শত্রুর উপর। মূল উদ্দেশ্য ছিল শত্রুর সব নৌকা এখানেই ডুবিয়ে দেওয়া। যদি বা কোনো নৌকা তার পরও এজায়গা পার হয়ে যেতে পারত, এরপর তো ছিলই নদীর দুই পাড়ে গড়া হাজীগঞ্জ ও সোনাডাঙ্গা দূর্গ। এখানে যুদ্ধ বাঁধার সঙ্গে সঙ্গেই অশ্বারোহী পাঠিয়ে দেওয়া হতো ওই দুটি দূর্গকে প্রস্তুত থাকার জন্য। ওই দুটি দূর্গে কামান ছাড়াও থাকত মূলত মীর জুমলার অশ্বারোহী বাহিনী। তারা এসে নদীর দুই পাশ ঘিরে ফেলত। কাজেই ভাঙা নৌকা ফেলে যারাই ডাঙায় উঠার চেষ্টা করত, তারাও ধরা পড়েই যেত।
চার কোনে রয়েছে এমন ওয়াচটাওয়ার
এই ত্রিভূজ প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদ করে কোনো শত্রুর পক্ষেই আর সোনারগাঁও বা ঢাকা অভিমুখে আসা সম্ভব হতো না। তবে এর পরেও কয়েক বছর পর নির্মাণ করা হয়েছিল ঢাকায় লালবাগ দূর্গ। দূর্গের আদলে একটি প্রতিরক্ষা প্রাচীর গড়ে তোলা হলেও লালবাগ সামরিক দূর্গ ছিল না, ছিল একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র।
ইদ্রাকপুর দূর্গে অন্তত একটি সুড়ঙ্গ ছিল, তা এখনো দেখা যায়। নদীর পাড় থেকে অস্ত্র, বাজার বা অন্যান্য রসদ আনা নেওয়ার জন্য এটি ব্যবহৃত হতো। যদিও এলাকায় এটি নিয়ে উপাখ্যানের শেষ নেই। অনেকেই তো মনে করেন, এটি নদীর নিচ দিয়ে প্রায় ২০-২৫ মাইল দূরে অবস্থিত লালবাগ কেল্লার সঙ্গে সংযোজিত ছিল। এই মতবাদটি সত্য হবার কোনো কারণ নেই। প্রথমত, ইদ্রাকপুর দূর্গ প্রতিষ্ঠা হয় লালবাগ দূর্গের প্রায় ১৮ বছর আগে। দ্বিতীয়ত, লালবাগ দূর্গ প্রতিষ্ঠাকালে মীর জুমলা তো আর বাংলার সুবেদারির দায়ীত্বেই ছিলেন না। আর তৃতীয়ত, লালবাগ দূর্গ নির্মাণের কাজ হয়েছে কয়েকটি ধাপে, কিন্তু তার কাজও কখনই শেষ হয়নি। শেষ না করেই নিশ্চয়ই দূরের একটি দূর্গের সঙ্গে সংযুক্তির কাজে হাত দেওয়া হবে না। আর সবশেষে, নদীর নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ নির্মাণ করার মতো প্রযুক্তি তখনও আবিষ্কারই হয়নি। কাজেই প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ইদ্রাকপুর দূর্গের সুড়ঙ্গ কেবল পাশের নদীর ঘাটের সঙ্গে সংযুক্তির জন্যই নির্মাণ করা হয়েছিল, আর অন্য কোনো কারণ নয়।
ইদ্রাকপুর দূর্গের বর্তমান অবস্থা
ইদ্রাকপুর দূর্গটি সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর অধীগ্রহণ করেছে বহু আগে, সম্ভবত ১৯০৯ সালে। বিভিন্ন সরকারের আমলে বেশ কয়েকবার এটি সংস্কার করা হয়েছে। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত সব ভাঙা দেয়াল মেরামত করা হয়েছে। উপরে উঠার সিঁড়িটি মোঘল নকশায় নতুনভাবে বানানো হয়েছে। কয়েক বছর পর পর নিয়মিতভাবে গজিয়ে উঠা গাছ উপড়ে ফেলা হয়, দেয়ালের ফাটলগুলি মেরামত করা হয় এবং এটিকে নতুনভাগে রং করা হয়, যে কারণে দেখতে বেশ সুন্দর। ভেতরের মাঠটি রোল করে সমান করে হয়েছে। সেখানে ঘন সবুজ ঘাস জন্মেছে। পাশে একটি জলাশয় আছে, যার ওপার থেকে দূর্গটি দেখতে ভারি সুন্দর লাগে।
কয়েক বছর আগ পর্যন্ত একটি সরকারি অফিসের কয়েকজন স্টাফ প্রভাব খাটিয়ে দূর্গের কিছু কক্ষ জোরদখল করে সপরিবারে অবস্থান করছিল। সম্প্রতি তাদেরও উচ্ছেদ করা হয়েছে। কাজেই এটি এখন একটি অত্যন্ত চমৎকার দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। তবে নিয়মিত নিরাপত্তা রক্ষীর অভাবে সন্ধ্যার পর থেকে এলাকাটি নিরাপত্তাহীন থাকে। বিভিন্ন রকমের বোতল এবং সিরিঞ্জ পড়ে থাকতে দেয়া যায়।
টাওয়ারের উপরে বসানো থাকত কামান
মগের মুল্লুক
মগের মুল্লুক কথাটির সঙ্গে আমরা প্রায় সবাই কমবেশি পরিচিত। একটি নিয়ম-শৃঙ্খলাবিহীন অবস্থা বা এলাকা বুঝাতে প্রায়ই এই কথাটি আমরা ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু কথাটি কোথা থেকে এসেছে, সেটি অনেকেরই জানা নেই। আবার ইদ্রাকপুর দূর্গসংক্রান্ত এই পোস্টটিতেই বা আমি কেন এটি টানলাম, তা নিয়েও অনেকেরই সংশয় থাকতে পারে। তাই কয়েকটি কথা বলা।
আমরা যে ব্রিটিশ শাসন বা ব্রিটিশ আমলের কথা বলি, তারও বহু আগে আরো কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ এশিয়ায় এসেছিল ব্যবসা বা সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য। তার একটি ছিল নেদারল্যান্ড। প্রথমে তারা গেছিল অস্ট্রেলিয়ায়। কিন্তু সুবিধা করতে না পেরে আসে এশিয়াতে এবং মূল ঘাঁটি গেড়েছিল বর্তমানের ইন্দোনেশিয়াতে। সেখান থেকেই ভারতবর্ষে এসে ব্যবসা করত। ১৬০২ সালে ওলন্দাজ সরকার ইউনাইটেড ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে, একচেটিয়াভাবে এশিয়াতে ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে। তারা প্রাথমিকভাবে কাছাকাছি ঘাঁটি গাড়ে আরাকানে (বর্তমান মিয়ানমার)। আরাকানি মারমা গোষ্ঠীর একটি অংশ এবং রাখাইন গোষ্ঠির একটি অংশ ওলন্দাজ নাবিকদের সঙ্গে বেশ ভাব জমিয়ে ফেলে। তাদের সব অপকর্মে যোগ দেয়। এই দুই সম্মিলিত গোষ্ঠিকে ওলন্দাজরা “মগ” নামে ডাকত। ওলন্দাজদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এরা নৌকা চালনায় সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে হানা দেওয়া আরম্ভ করে। এদের বড় একটি উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন এলাকা থেকে ডাকাতি করা ছাড়াও অল্পবয়সী মানুষ ধরে নিয়ে ওলন্দাজদের কাছে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করা।
এক সময়ে এরা এতই সাহসী হয়ে উঠে, যে বঙ্গে প্রবেশ করা আরম্ভ করে। প্রথমে চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক হলেও এরপর মেঘনা নদী ধরে ঢাকা পর্যন্ত চলে আসত। তারা আসা মানেই এক অরাজক পরিবেশ আর ত্রাসের রাজত্ব আরম্ভ হতো। এখান থেকেই মগের মুল্লুক কথাটির উৎপত্তি।
দূর্গের সীমানা প্রাচীর
হীরক ব্যবসায়ী থাকাকালীন বহুবার মগ জলদস্যুদের সঙ্গে ঝামেলায় পড়েছিলেন মীর জুমলা। বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হবার পর প্রথমবার তাদের আক্রমণ হবার পরই মীর জুমলা সিদ্ধান্ত নেন, যে কোনো মূল্যে এদের পরাভূত করতে হবে। তাই শুধু বিতাড়িত নয়, নৌকা ডুবিয়ে দিলেই তারা ডাঙায় উঠতে বাধ্য হতো। সেখানেই সৈন্যরা এদের মেরে ফেলত। এভাবে ধীরে ধীরে জলদস্যুদের আক্রমণ দুর্বল হতে হতে এক সময়ে বন্ধ হয়ে যায়। তবে মগদের আক্রমণ বন্ধ হলেও ‘মগের মুল্লুক’ কথাটি সারা বাংলায় এখনো চালু থেকে গেছে!
একটি সাম্প্রতিক চমক
বছর কয়েক আগে দূর্গটির নিচতলার একটি কক্ষের মেঝের একটি অংশ হঠাত ভেঙে দেবে যায়। এমনিতেই এই কক্ষগুলি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। তবে এই দুর্ঘটনায় মাটির নিচ থেকে যা বেরিয়ে আসে, তা নিয়ে ব্যাপক বিস্ময় এবং আলোচনায় আসে দূর্গটি। এর মেঝের নির্মাণ কৌশল নিয়ে বেশ কিছু বিশেষজ্ঞকে ডাকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।
মেঝের আস্তরণের নিচে পাওয়া যায় উপুড় করে পাশাপাশি গায়ে গা লাগিয়ে বসানো অসংখ্য মাটির কলস। সবগুলি একদম নিখুঁত সারি সারি করে বসানো। কেউ কেউ তো আবার ভেবেই বসেছিলেন, এগুলি স্বর্ণ বা মণিমুক্তায় ঠাসা থাকতে পারে। কিন্তু ভেঙে যাওয়া কলসের ভেতরে যেমন কিছুই ছিল না, আবার আমান দুটি কলস ফাটিয়েও ভেতরে কিছুই পাওয়া যায়নি। স্বাভাবিকভাবেই বুঝা উচিৎ ছিল, ভেতরে কিছু রেখে দিলে তো আর উপুড় করে কলস বসানো হতো না!
আসলে এটি ছিল একটি বিশেষ নির্মাণ প্রযুক্তি। দূর্গটি গড়া হয়েছিল নদীর পাশে। মাটির নিচ থেকে আর্দ্রতা মেঝে চুয়ে উঠবেই। এই দূর্গ নির্মাণের প্রায় সাড়ে চারশ বছর পর এখনো যে নির্মাণ প্রযুক্তিতে বাড়ি বানানো হয়, তারও তো নিচতলার মেঝে বিশেষ করে বর্ষাকালে আর্দ্রতার কারণে ভিজে যায়! এই ঘরটি যদি বন্ধ থাকে, পুরো ঘরের বাতাস আর্দ্রতায় ভরে যাবেই। আর এখানে যদি গোলাবারুদ রাখা হয়, আর্দ্রতাতে সেগুলি নষ্ট হয়ে যাবে। যে কারণে একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলেন মীর জুমলা। খালি মাটির কলসি পাশাপাশি উপুড় করে বসিয়ে তার উপর ঢালাই করা হয়েছিল চুন-সুড়কি। এতে নিচের মাটি এবং উপরের ঢালাইয়ের মাঝে বাতাসের একটি স্তর থেকে যায়। আর্দ্রতা সেই বাতাসের মধ্যেই বন্দি হয়ে থেকে যাবে। বেশি জমলে মাঠির কলসির গায়ে শুষে নেবে। আরও বেশি জমলে কলসির গা গড়িয়ে নিচে পড়ে যাবে মাটির উপর। সেখান থেকে শুকনা মৌসুমে সেটি মাটি শুষে নেবে। এতে কক্ষটিতে বছরের কোনো সময়েই আর্দ্রতার সমস্যা হতে পারবেই না।
দূর্গের ভেতর থেকে প্রাচীরে একটি ছিদ্র দেখতে পেলেও প্রতিটিই চারভাগে বিভক্ত
এটি আবিষ্কারের পর বিশেষ করে স্থপতি মহলে বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল। বহু স্থপতি গিয়ে দেখে এসেছেন। এমনকি বিভিন্ন দেশ থেকেও কিছু স্থপতি এসেছিলেন এটি দেখার জন্য। এখন অবশ্য আবার কক্ষগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে জনসাধারণের জন্য। কেননা অনেকেই গিয়ে আবার সেখান থেকে কিছু পুরোনো কলস শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সংগ্রহের জন্য নিয়ে আসারও চেষ্টা চালিয়েছিল!
কীভাবে যাবেন
ইদ্রাকপুর দূর্গটি মুন্সীগঞ্জ শহরের ভেতরেই। বাস স্ট্যান্ডে নেমে যেকোনো রিকশা বা অটোরিকশা চালককে বললেই নিয়ে যাবে।
ভ্রমণ যখন বা যেখানেই করি না কেন, পরিবেশের পরিচ্ছন্নতার দিকে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। সবাই যে করে, তা নয়। এই স্থাপনাগুলি দেখতে গেলে অবহেলার বিষয়টি আরও বেশি চোখে পড়ে। আপনার পরবর্তী প্রজন্মের ভ্রমণ পীপাসুদের জন্য হলেও আপনার ব্যবহৃত জিনিস, যেমন পানির বোতল, চিপসের প্যাকেট ইত্যাদি নির্ধারিত জায়গায় ফেলুন বা সঙ্গে করে নিয়ে আসুন।
এসএন