গাজীপুরের কালিয়াকৈরের সিনাবহ খন্দকার পাড়া এলাকায় ঈদের আগের দিন বন বিভাগের উচ্ছেদ অভিযানে শতাধিক বসতঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযানের পর এলাকাজুড়ে নেমে আসে কান্নার রোল, হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ঈদের আনন্দের বদলে শত শত মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে।
রবিবার সকাল ৯টা থেকে ঢাকা বন বিভাগের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। অভিযানের শুরুর দিকে এলাকাবাসী বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও পুলিশের সহযোগিতায় অভিযান পরিচালিত হয়। চারটি বুলডোজারের সাহায্যে একে একে শতাধিক বসতঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। অনেকেই ঘরের ভেতর থেকে আসবাবপত্র বের করার সুযোগ পাননি, মালামালসহ ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বন বিভাগ মাত্র একদিন আগে শনিবার বিকেলে মাইকিং করে জানায় যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। এত কম সময়ের মধ্যে ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি, ফলে তারা অসহায় অবস্থায় পড়েছেন।
এক ভুক্তভোগী বলেন, "কাল ঈদ, আমাদের ঘরে একমুঠো চাল পর্যন্ত নেই। আমরা ছোট ছোট সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তার আগেই আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দিলো।"
আসমা বেগম নামে আরেকজন জানান, "আমরা ঘরবাড়ি তৈরির সময় বন বিভাগের লোকদের সাথে আলোচনা করেই কাজ করেছি। এখন তারা হঠাৎ এসে আমাদের সবকিছু গুঁড়িয়ে দিলো।"
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চন্দ্রা রেঞ্জের আওতাধীন সিনাবহ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বনভূমি দখল করে বসবাস করা হচ্ছিল। দখলদারদের সরে যেতে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, এরপরও তারা দখল ছাড়েনি বলে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে।
চন্দ্রা রেঞ্জ কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম বলেন, "সরকারের নির্দেশক্রমে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তবে ঈদের আগের দিন অভিযান চালানো কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। ঈদের পরও আমরা পুনরায় অভিযান পরিচালনা করবো।"
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, "যারা ঘর তুলেছে, তারা টাকা দিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো টাকা নেইনি।"
অনেক ভুক্তভোগীর দাবি, তাদের জমির বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও বন বিভাগ কোনো যাচাই না করেই তাদের বসতভিটা ভেঙে দিয়েছে। আব্দুল জলিল নামে এক ব্যক্তি বলেন, "আমার বাড়ি শত বছরের পুরোনো, আমার জমির কাগজপত্র সঠিক রয়েছে। কিন্তু তারা কিছু না দেখেই আমার ঘর ভেঙে দিয়েছে।"
উচ্ছেদ অভিযানের সময় এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে বন বিভাগের লোকজনকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে বন বিভাগের এফডিএম (নৌ চালক) মিনহাজির ওপর হামলা চালানো হয়, এতে তার মাথা ফেটে যায়। পরে বন বিভাগের অন্য কর্মকর্তারা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান।
বন বিভাগ জানিয়েছে, দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বনভূমি পুনরুদ্ধারে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে। তবে ঈদের আগের দিন এ ধরনের উচ্ছেদ অভিযান কতটা ন্যায়সংগত, তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো অন্তত এক সপ্তাহ সময় পেলে তারা ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে পারত বলে মনে করছেন অনেকে।
স্থানীয়দের দাবি, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের অভিযানের সময় ও প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করে। বিশেষত ধর্মীয় উৎসবের সময় এমন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা সাধারণ মানুষের ওপর চরম দুর্ভোগ বয়ে আনে।