কাটছে নির্ঘুম রাত, নদীগর্ভে অর্ধশত বছরের বাজার

'জীবনে অনেক দুর্যোগের দেখেছি। এই বেড়িবাঁধের পাশে একসময় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঘর-বাড়ি সবই ছিল আমার। আস্তে আস্তে তা সব নদীতে চলে গেছে। সব হারিয়ে শেষমেষ বাঁধের উপরে বসবাস শুরু করেছি। তাও এখন নদীর পেটে যাওয়া শুরু করছে। রাত হলে ঘুমাতে পারিনা, বাঁধের কাছে বসে থাকি'।
কথাগুলো বলছিলেন, বরগুনা সদর উপজেলার পায়রা নদীর পাড়ের পালের বালিয়াতলী এলাকার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ ইসমাইল মৃধা। বঙ্গোপসাগরের কোলকঘেষা দক্ষিণের জনপদ উপকূলীয় বরগুনার রক্ষাকবচ একমাত্র বেরিবাঁধ সহ জীবনে তিনি সাক্ষী হয়ে আছেন অগণিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের।
শুধু তাই নয় খরস্রোত আগ্রাসী পায়রা নদীর ভাঙ্গনে চোখের সামনে বিলীন হতে দেখেছেন ফসলি জমি, ৫০ বছরের পুরাতন বাজার। এক সময় পায়রার পাড়ে বাজারে ইসমাইল মৃধার নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকলেও সবকিছু হারিয়ে এখন কোনমতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ে তার ঠাঁই হয়েছে বেরিবাঁধের উপর। সেই বেরিবাঁধও এখন বিলীন হওয়ার পথে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বরগুনা সদরের পায়রা নদীর পাড়ের পালের বালিয়াতলী এলাকার এক কিলোমিটার বেরিবাঁধ ভাঙতে ভাঙতে এখন নাজুক অবস্থা। বাঁধ সংলগ্ন বাসিন্দাদের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্কে। ঝড় জলচ্ছাস দেখা দিলে নির্ঘুম রাত কাটে তাদের।
স্থানীয়রা জানান, বড় ধরনের কোন জোয়ারের চাপ বা ঘূর্ণিঝড় হলে নাজুক এই বাঁধ বিলীন হয়ে প্লাবিত হবে ১০ টি গ্রাম। নোনা পানি ঢুকে ক্ষতি হবে ফসলি জমি। এখানে বেড়িবাঁধের সন্নিকটেই রয়েছে শত শত বছরের পুরাতন রাখাইন পল্লী। যেখানে বাঁধ বিলীন হয়ে ঐতিহ্য হারানোর আশংকায় রয়েছে রাখাইন পল্লিটি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত চার বছর আগে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে এখানে ৮০০ মিটার বেরিবাঁধ ব্লক দিয়ে করা হলেও ভাঙ্গন কবলিত বাকি অংশ এখন হুমকির মুখে। তাই স্থানীয়দের দাবি টেকসই মজবুত বেরিবাঁধের।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. মাসুদ বলেন, পায়রা নদীর ভাঙ্গনের কবলে বিলীন হয়ে যাচ্ছে আমাদের এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের প্রায় এক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। বছরের পর বছর এমন ভাঙ্গনে ফসলি জমি, অর্ধশত বছরের পুরাতন বাজার সবকিছু চলে গেছে আগ্রাসী পায়রা নদীর গর্ভে।
জাফর হাওলাদার নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, যেকোনো মুহূর্তে বাঁধ বিলীন হয়ে প্লাবিত হতে পারে এখাকার ১০ টি গ্রাম। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়বে হাজার হাজার মানুষ। ক্ষতি হবে ফসলি জমি, মৎস্য চাষের। তাই আতঙ্কে দিন কাটছে বালিয়াতলীর বাসিন্দাদের।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বারবার ধন্না দিলেও কোন সুরাহা করছেন না। আগামী ছয় মাসেও এই সমস্যার সুরাহা হবে বলে মনে হচ্ছে না। এর মধ্যে যেকোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম টেকসই মজবুত বাঁধ নির্মাণের আশ্বাস দিয়ে বলেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্পের মাধ্যমে ব্লক দিয়ে বাঁধটি করা হবে। ইমারজেন্সি কাজ করার জন্য প্রধান প্রকৌশলীর কাছে প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। বাজেট পেলেই কাজ শুরু করা হবে।
এএজেড
