শুক্রবার, ৪ এপ্রিল ২০২৫ | ২১ চৈত্র ১৪৩১
Dhaka Prokash

ধারাবাহিক উপন্যাস : পর্ব -১

স্নানের শব্দ

সকাল বেলা, গোসলের নির্জন শীতলতায় ডুবতে ডুবতে একটুখানি ব্যক্তিগত সময় উপভোগের স্বাধীনতা পায় শবনম। সাবান শ্যাম্পুর রেশম ঘন ফেণার প্রলেপ সুঘ্রাণ আর মাথা মুখ বেয়ে অবিরাম নেমে আসা জলজ ধারার ভেতর দৈনন্দিন কর্তব্য জ্ঞানের বাইরে আর দর্শক সম্ভবনাবিহীন একান্ত সময়ে, মুক্তি পাবার মত বিরল আনন্দে নিজের দিকে সামান্য মনোযোগ দেয়ার খানিকটা অবকাশ মেলে হয়তো। স্নানঘরের মৃদু মসৃণ আলোতে গুন গুন করে একটা পুরনো গানের সুর ভাজা, সমস্ত দেহে মনে একটা সতেজ প্রফুল্ল অনুভব মোলায়েম আমেজ মেখে ছড়িয়ে পড়ে।


মাথা বুক ছাড়িয়ে পানির ধারা নিচের দিকে প্রবাহিত হলে ঘাড়টা সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকিয়ে চোখ নেমে যায় নাভিকুণ্ডলী ছাড়িয়ে আরো আরো নিচে আর তখনি চকিতে চমকে উঠে শবনম। একি! তলপেট সংলগ্ন কালো উপত্যকাতেও এবার যে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে কয়েকটি রূপালি ঝলক। এত দিন একটু একটু করে মাথার কেশ রঙ বদলে রূপালি হচ্ছিলো, এবার তা হানা দিলো একান্ত ভুবনেও, হা সময়! হা রূপান্তরের রোমাঞ্চিত বেদনা! প্রকাশ্য কুন্তলদামে দিব্যি না হয় রং মেখে কালো করা চলে কিন্তু এই গোপন গহীন অলিন্দে? বিদেশে নাকি অনেকে ফ্যাশন করে নিম্নাঙ্গের পশমও বিভিন্ন রঙে রঙীন করে নেয় .. কে জানে সেটা সত্যি না গল্প! একটু ঝুঁকে আবারো মাথাটা সামান্য নুইয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে দেখে সে। নিজেকে অথবা নিজের শরীরকে, এই শরীরটাই কি সে? নাকি শরীরের অন্তরালে মন বলে কোন বস্তু আছে, যে বস্তুকে আদতে দেখা যায় না, ছোঁয়াও যায় না! আর এই চর্মচক্ষু তো শুধু সেটুকুই দেখে, যা তার সীমিত ক্ষমতায় দেখা যায়, যতটা দেখা যায়। আহা, ক-ত-দি-ন, কতদিন পর খেয়াল করে নিজের চোখে নিজেকে দেখা, যেন পুরনো ট্রাংকে রেখে দেয়া এক যাদুগালিচার ভাঁজ খুলে তাকানো, কোথাও তার ধূলা জমেছে, কোথাও সামান্য টুটা-ফাটা, কোথাও সূতা ঢিলা হয়ে গেছে, রং জ্বলে গেছে কোথায়ও। পাঁচ ফুট সাড়ে চার ইঞ্চির দীর্ঘ দেহ, তার গিরিখাদ, উপত্যকা, টিলা, তৃণ ভূমি..।

শবনমের চোখ এবার তার চিল দৃষ্টিতে মন স্থির রেখে দেখছে, পাকা ফলের মতো একটা সুপুষ্ট পরিণত জীবনের ছবি, দেখছে,ঈষৎ শিথিল স্তন, পৃথুল তলপেট, সামান্য ভারি উরু, দেখছে নিজের সময়ের বলয়ে পাক খাওয়া একজন নারীকে, এই মুহূর্তে যাকে বিস্মিত করেছে নিজেরই গোপন অঙ্গের কয়েকটি শ্বেত কুঞ্চিত চুল।

কিন্তু শবনম তো জানতোই এমন ঘটবে, প্রতিটি মানুষই জানে, এ কোন আকস্মিক ঘুর্ণি নয়, এটি অনিবার্য প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া যা এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। বাউণ্ডলে সময় তার নিজগতিতেই সব কিছু পেছনে ফেলে ছুটে চলে। তবে কেন এই বিপন্ন বিস্ময়? পোশাক পরতে পরতে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে শবনম। এই সুচিক্কন শুভ্রতা, যা একই সঙ্গে বয়স বাড়ার সংকেতও বহন করে এনেছে, বলছে, পৌছে গেছো বসন্তের প্রান্ত সীমায়, শুনতে পাচ্ছো কি বেলা শেষের গান? সেই যাত্রা শেষের ইঙ্গিত, সেই সূর্য ডোবার উপলব্ধি কি অন্তর্গত রক্তের ভেতর একটা মৃদু ধাক্কা দিয়েছে? মনের গভীরে একটা নীল নিঃসীম শূন্যতা দড়ির মতো পাকিয়ে তুলেছে?

‘সামান্য ব্যাপার নিয়ে বেশি বেশি ভাবা হচ্ছে, দূর !’
মন থেকে জোর করে বিষয়টা ঝেড়ে ফেলতে চায় শবনম।

ফিরোজা আর সাদায় মেশানো তাঁতের শাড়িটা পরা শেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ দিনের অভ্যাসবশত সামান্য প্রসাধন নেয় সে। মুখে ক্রীম ঘষতে ঘষতে আয়নার খুব কাছে গিয়ে চোখ ও গলার নিচে সেকি এখন বলি রেখা খুঁজছে? বয়স? অনেকেই আজকাল বলে, বয়স তোএকটা সংখ্যা মাত্র। বয়স বাড়তে থাকলে বয়সের কথা নাকি ভুলে যেতে হয়,শবনম মাঝে মাঝে ভুলে যায়ও। কিন্তু আয়নায় এখন যার ছায়া পড়ছে বয়সের সংখ্যা হিসেবে তাকে তো মধ্য বয়সিনীই বলা চলে। যদিও লোকে বলে, চেহারা দেখে শবনমের বয়স অনুমান করা যায় না। তার সহজ মুখচ্ছবি, লম্বাটে গড়ন অনায়াসে পাঁচ/দশ বছর লুকিয়ে রাখতে পারে। এখনো রজঃনিবৃত্তি হয়নি তার, তবে হবে তো নিশ্চয়ই, দিনে দিনে দিন ফুরাবে, প্রাকৃতিক নিয়মেই সবুজ পাতা হলুদ হয়ে ঝরে যাবে তবে তাই বলে কি জীবন থেমে থাকে? চোখে কাজল আর ঠোটে হাল্কা লিপষ্টিক বুলিয়ে শবনম পুরোপুরি তৈরি হয়ে যায় অফিসে যাওয়ার জন্য।

ততক্ষণে তারেকের ঘুম ভেঙেছে। বিছানার উপর এক মগ কফি আর দিনের খবরের কাগজ মেলে নিয়ে বসেছে ও। মুখে গালে একদিনের না কামানো সাদা রঙের খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোঁফ। সেইদিকে তাকিয়ে আবার স্নানঘরের কথা মনে পড়ে গেলে বিব্রত বোধ করে শবনম।

‘ঘুম ভাঙলো?’ শবনম কিছু বলতে হবে তাই একটা প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।

তারেক পত্রিকা থেকে চোখ সরিয়ে শবনমের দিকে তাকায়, তার বড় বড় চোখে প্রশংসার দৃষ্টি, ‘আরে বাহ্ খুব সুন্দর লাগছে তোমাকে, ফিরোজা রংটা তোমাকে বেশ মানায়..’

শবনম একটু হাসে। বলে, ‘হুম, বুড়ি হয়ে যাচ্ছি, খালি মাথায় না, উপরে নিচে সবখানে চুল পাকতে শুরু করছে..’
‘ওয়াও, বয়স বাড়লে প্রেম পোক্ত হয়, জানো না? কয়েকদিন আগে একটা আর্টিকেল পড়লাম, মধ্যবয়সে শরীরের ভালোবাসা বেশি জমে ..’

‘হইছে, হইছে। এইবার থামো।’

শবনম তারেককে থামিয়ে মাস ছয়েক ধরে পক্ষাঘাতে পর্যূদস্ত শাশুড়ির ঘরে উঁকি দেয়। ওষুধের গন্ধে ভরা প্রায় অন্ধকার ঘরে সাদা ম্যাক্সি পরা ছোটখাটো সালেহা খাতুন জ্বলন্ত তসবিহ’র মতো বিছানায় লেপ্টে শুয়ে থেকেও জ্বলজ্বল করছেন। তার মাথার কাছে রাতের নার্স চম্পা বড়–য়া, সারারাত ডিউটি শেষে বাড়ি ফেরার জন্য তৈরি হচ্ছে, এরপর আসবে মোমেনা, তার ডিউটি সারা দিনের। শবনম প্রতিদিনের মতো রোগীর ভাল-মন্দ নিয়ে আবেগহীন কয়েকটা রুটিন প্রশ্ন করে। দরকারি ওষুধ পথ্য আছে কিনা খোঁজ খবর নেয়। ঘুমন্ত সালেহা খাতুনের মাথায় একটু হাত রাখে। তারপর যায় মেয়ের ঘরের দিকে।


শ্রাবণের রুমের দরজায় গিয়ে একটা ছোটখাটো ধাক্কা খায় শবনম, ওর দরজায় একটা ষ্টিকারে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা-
‘ভোর ৫টায় ঘুমিয়েছি, দুপুর ২টার আগে ডাক দিওনা।’

আজ সারাদিন আর মেয়েটার সাথে দেখা হবে না, বুঝে গেছে শবনম। কিভাবে যে বড় হয়ে গেল বাচ্চাটা, শবনম যেন টেরও পেলোনা। তারেক আর সালেহা খাতুন নিজের হাতে শ্রাবণের লালন পালনের দায়িত্ব তুলে নিয়ে শবনমকে নিজের কাজে মন দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। সেইজন্য স্বামী ও শাশুড়ির প্রতি কিছুটা কৃতজ্ঞতা বোধ করে শবনম। যদিও তিনমাসের বাচ্চাকে কারো হাতে ছেড়ে দিয়ে অফিস করতে যাওয়া খুব সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না তার জন্য। যেন নিজের কলিজাটা ছিঁড়ে রেখে বাইরে যেতে হচ্ছে, আর নারীদের সেই চিরন্তন ডিলেমা তো ছিলোই, অফিসে এলে বাচ্চার জন্য মন কাঁদে, অপরাধ বোধ হয়, বুঝি অফিসের কাজে কম মনোযোগ দিচ্ছে, আবার বাসায় এলে মনে হয়, অফিসে সময় দিতে গিয়ে বোধ হয় বাচ্চার ঠিকমতো যত্ন নিতে পারলাম না, আমি এক অযোগ্য মা।

শবনমের অনেক বান্ধবীই বাচ্চার জন্য মাঝ পথে চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঘরে বসে গেছে। তারা যেন অনিচ্ছায় বা স্বেচ্ছায় সেই শাস্ত্রীয় বাণীকেই গ্রহণ করেছে, ‘সন্তান প্রসব করা, সেই সন্তানের যত্ম নেওয়া এবং পরিবার সামলানো একজন নারীর প্রথম ও প্রধান কর্তব্য।’ নিলুফার যেমন, বাইয়িং হাউজে জেনারেল ম্যানেজারের চাকরিটা ছেড়ে দিলো শুধুমাত্র সংসার সামলানো আর বাচ্চা মানুষ করার অজুহাতে। কাজের লোকের হাতের রান্না ওর বরের মুখে রোচেনা, আর বাচ্চাকে মা ছাড়া অন্য কারো তত্ত্বাবধানে রাখতেও তার ঘোর আপত্তি। শ্রাবণের জন্মের পর তারেকের ব্যবসাটা যদি ভালো যেত, যদি সংসার চালাতে শবনমের উপার্জনটা জরুরি না হতো, তাহলে তারেক’ও কি অন্য পুরুষদের মতো ওকে চাপ দিতো চাকরি ছেড়ে ঘরে বসে বাচ্চা পালনের জন্য। কিন্তু সেটা কি মনে প্রাণে মানতে পারতো শবনম? মনে হয় না। এখন যেমন ছেলে মেয়েরা বড় হয়ে যাবার পর নিলুফার খুব আফসোস করে ওর অন্যান্য সহকর্মীদের উন্নতি দেখে।

‘প্রফেশনে থাকলে আমার অবস্থানটা এখন কোথায় থাকতো বল !’

‘যা হয় নাই, তা হয় নাই। বাচ্চাদের নিজ হাতে বড় করছিস, সেটাও তোএকটা তৃপ্তি !’ বান্ধবীরা ওকে সান্তনা দিয়ে বলে।

‘হুম.. পাখির ছানারা উড়তে শিখে গেলে তারা কি আর মা পাখির কথা মনে রাখে? ডানা মেলে কোথায় উড়ে যায়!’
নিলুফার দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

সকালের তাড়াহুড়ায় লম্বা করে শ্বাস ফেলারও সুযোগ নেই শবনমের। তার তৃতীয় কর্তব্য গৃহ সহকারি রাহেলার সাথে সারাদিনের রান্না-বান্নার প্ল্যানিংটা সেরে নেয়া।

‘পিয়াজ আর তেল আনা লাগবো। মুরগি আর মাত্র দুইটা আছে, কালকেই লাগবো, খালাম্মার স্যুপের জইন্য। আজকে মাছ রান্ধি আর সবজি, ডাইল। ছুটু আম্মার জইন্য কি করুম? মাছ তো খাইবনা..’
শ্রাবণের জন্য দুপুরবেলা আলাদা করে খাশির মাংশ রান্নার বিধান দিয়ে চট করে ঘড়ির দিকে তাকায় শবনম, নাহ্ আর দেরি করা যায় না। ছোট্ট একটা ব্যাগে দুপুরের জন্য কয়েকটা ফল, এক পিস পাউরুটি আর বোতল ভর্তি পানি নিয়ে বাইরে বেরুনোর জন্য রওনা করে সে। একজন চাকুরিজীবী নারীর নিত্যদিনের সকাল বেলার রোজনামচা, একই ছকে, একই সুরে, একই তাল, একই লয়ে বাঁধা। এই জীবনে বাঁধা-ধরা কিছু দায়িত্ব কর্তব্যের বাইরে যার তেমন রোমাঞ্চ নাই, উত্তেজনা নাই, ঘটনা নাই। অথচ বাইরে থেকে তাকে তো সফল নারীই বলবে সবাই, নিজের সাফল্য নিয়ে শবনমের একটা চাপা আনন্দও হয়তো আছে। বাইশ বছরের চাকরি জীবনে নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে ক্যারিয়ারের মধ্য গগনে এখন তার অবস্থান, কোম্পানির তৃতীয় ব্যক্তি সে। ঘরে প্রেমময় স্বামী, আপাত দৃষ্টিতে বাধ্যগত সন্তান, সুস্থ নিরোগ দেহ, চমৎকার ফ্ল্যাট, নিজস্ব গাড়ি সব সূচকেই তাকে ভাল নম্বর দেয়া চলে। কিন্তু এই ভালই কি সব? তা না হলে হঠাৎ কেনো বুকের ভেতর শুকনো পাতা গুড়িয়ে যাওয়ার মতো করুণ শব্দ বেজে ওঠে? কেন মনের ভেতর বালু ঝড়ের মতো এমন এলোমেলো হাহাকার উঠে? কেন হঠাৎ সব শূন্য শূন্য মনে হয়? বয়সের জন্য? সবারই কি এমন হয়? কি পেলাম কি পাইনি, সেই হিসাব কখনোই মিলাতে চায়নি শবনম, তাহলে এই পরিণত বয়সে এসে কি এক অচেনা বেদনা কেনো তাকে এভাবে আচ্ছন্ন করে? কেন উদাস কোনো পথ পেরিয়ে দূরে কোথাও কোনো অচিনপুরে চলে যেতে ইচ্ছা করে? একেই কি মিডল এইজ ক্রাইসিস বলে?

পাঁচতলার জানালা দিয়ে তাকালে রাস্তার পাশে একটা একহারা সবুজ নিম গাছ চোখে পড়ে, এই রুক্ষ্ম ইটকাঠের ভেতর সবুজ সতেজতাটুকু ধরে রেখে কিভাবে যে সে লড়াই করে টিকে আছে সেও এক রহস্য বটে। নিমগাছটার সঙ্গে নিজের জীবনের এক ধরনের সুক্ষ্ম মিল খুঁজে পায় শবনম। মিলটা একাকীত্বের, শবনম জানে যত উপরে উঠা যায় ততই একা হয়ে যেতে হয়, পর্বতের সুউচ্চ চূড়ায় জায়গা কমই থাকে। কিন্তু এই উর্ধ আরোহণের পেছনে লড়াইয়ের যে দীর্ঘ ইতিহাস রচিত হয়ে আছে, পেছন থেকে টেনে ধরা ধারালো থাবাগুলোর নখচিহ্ন যে চিরস্থায়ী দাগ বসিয়ে গেছে, সেসবের মোকাবেলা করতে করতে মাঝে মাঝে চরম ক্লান্তি আর অবসাদ যে পেয়ে বসে না, তা তো নয়। কিন্তু সেসব পাত্তা দিলে কি আর চলে? কে যেন বলেছিল, নীচের দিকে নয়, যতই উপরের দিকে উঠবে ততই তুমি বাঘ, সিংহ আর নেকড়ের দেখা পেতে থাকবে। তারা সহজে জায়গা ছাড়বে না, নখ দন্ত বিকশিত করে তোমাকে থামাতে আসবে। তারপরেও জীবন চলমান,ঘাত-প্রতিঘাত পেছনে ফেলে একে সামনের দিকে চালিয়ে নিতেই হবে, ‘তরী খানি বাইতে গেলে’ পথের মাঝে ছোট বড় তুফান মেলে, তাই বলে তো জীবনের হাল ছাড়া চলবে না, থামলেই বিপদ, থামলেই পেছনে পড়ে যাওয়া।

একবার একটা ট্রেনিং-এ কে যেন বলেছিল, আপনি যদি দৌড়ে সবার সামনে গিয়ে কোন কারণে দাঁড়িয়ে পড়েন, তাহলেও পেছন থেকে অন্যরা এসে আপনাকে ধরে ফেলবে, চাই কি আপনাকে পেছনে ফেলে তারা সামনে এগিয়েও যেতে পারে। সুতরাং নিজের জায়গাটা ধরে রাখতে চাইলে থামলে চলবে না। দৌড়ে যেতে হবে যতক্ষণ পা চলে। জীবন চলিষ্ণু। জীবন যতক্ষণ কর্মময় ততক্ষণই তা মধুময় আনন্দময়।

অফিসে গিয়ে এক মগ গরম ব্ল্যাক কফি সামনে নিয়ে সারাদিনের কাজের প্ল্যানিং-এর উপর চোখ বুলিয়ে নেয়ার অভ্যাস শবনমের। কফি শেষ করে ই-মেইল চেক করে দরকারি নির্দেশনাগুলো দিয়ে দেয় সে। অধস্তনরা আসে ফাইল পত্র নিয়ে। এখন যেমন এডমিনের নতুন ছেলেটা কাঁচের দরজায় নক করে কয়েকটা ফাইল নিয়ে ঢুকেছে তার ঘরে। দরকারি সিগনেচার গুলা করতে করতে কেন যেন বারবার হাই উঠছিলো শবনমের।

‘আপনার কি শরীর খারাপ ম্যাডাম?’

হঠাৎ কোমল কন্ঠে জানতে চাইলো ছেলেটা। এই অফিসটা ততটা ফরমাল নয়, ফলে সিনিয়র কলিগকে এ ধরনের প্রশ্ন করাটা হয়তো স্বাভাবিকই মনে করেছে সে। কিন্তু প্রশ্নের ধরণ শুনে হঠাৎ করে মেজাজটা প্রচণ্ড গরম হয়ে গেল শবনমের। ফাইলটা এক পাশে সরিয়ে রেখে সে ঠাণ্ডা গলায় জানতে চাইলো, ‘কেন?’

‘না, মানে..ম্যাডাম, তেমন কিছু নয়, দেখে মনে হলো আর কি, একটু অসুস্থ .. চেহারাটা কেমন ফ্যাকাশে..’
‘শোনো ছেলে, তোমার চোখের চিকিৎসা করাও। মনের চিকিৎসাও করাতে পারো, তোমার মন ভুল অনুমান করছে। বুঝতে পেরেছো? ভবিষ্যতে এরকম হঠাৎ করে না জেনে শুনে কাউকে অসুস্থ বলে বসবে না। এটা গুড ম্যানার নয়।’

শবনম প্রতিটা শব্দে জোর দিয়ে নীচু কিন্তু তীব্র কন্ঠে বলে।
‘জ্বি¦ ম্যাডাম। সরি ম্যাডাম।’

ছেলেটা কাঁচুমাচু হয়ে ফাইল গুছিয়ে চলে গেলে শবনমের মনে হয়, এতোটা প্রতিক্রিয়া দেখানো বোধ হয় ঠিক হয়নি। কুল হও শবনম, শান্ত হও, মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করো। ঘটনাগুলো ইতিবাচক ভাবে দেখো। তারেক ইদানিং খুব মেডিটেশনের দিকে ঝুঁকেছে, মনে প্রশান্তি আনতে মেডিটেশন খুব নাকি কাজ দেয়। অস্থিরতা দূর করে, মনে আনন্দ আসে, মনোদৈহিক সুস্থতা বাড়ে। শবনম কয়েকবার চেষ্টা করে দেখেছে,তার মন বসে না। চোখ বন্ধ করলেই যত রাজ্যের জাগতিক চিন্তা ভাবনা এসে ভিড় করে, আর মাথার মধ্যে কাঠ ঠোকরার মতোন টুকটুক করে ঠোকড়াতে থাকে। শবনম কিছুতেই এক বিন্দুতে মনোযোগ বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারে না। তারেক অবশ্য উৎসাহ দেয়, বলে, ‘প্রথম প্রথম এমন হবে, অন্য সব ভাবনা আসবে, ধৈর্য্য ধরে প্র্যাকটিস করো, দেখবে মন বসবে, মনের মধ্যে একটা গভীর শান্তির অনুভূতি তৈরি হবে।’

কিসের কি? এতো প্র্যাকটিস করার ফুরসৎই বা কোথায়? তাকে তো সারাক্ষণই ব্যস্ত সৈনিকের মতো বন্দুক কাধে ছুটতে হচ্ছে, মিটিং, সিটিং, মনিটরিং, ফাইলিং, প্ল্যানিং-এর বোঝা মাথায় নিয়ে বস, ক্লায়েন্ট আর কলিগদের সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে লেফটরাইট করতে করতে। এ এক অদ্ভুত যুদ্ধক্ষেত্র। পায়ের নিচে কে যে কোথায় মাইন পেতে রেখেছে জানা নেই, একটু এদিক ওদিক হলো তো ভয়ংকর বিস্ফোরণ, চোখের পলকে শহীদ হয়ে যাওয়া। চোখ কান খোলা রেখে দুষ্ট লোকদের অফিস পলিটিক্স এড়িয়ে নিজের অবস্থানটা ঠিক রাখতে কম পেরেশানি তো আর করতে হয় না। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের কথা মনে পড়ে শবনমের। কত সরল ছিল সে তখন! অনেক কিছুই বুঝতো না, ঊর্ধ্বতনদের কথার প্যাঁচ ধরতে না পেরে বোকার মতো শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকতো। চোখের সামনে হাসতে হাসতে ওর কাজের ক্রেডিট নিয়ে নিতো অন্য কেউ। মানুষের এইসব তঞ্চকতা দেখে প্রতিবাদ করার বদলে হতভম্ব হয়ে পড়তো শবনম। নিজের আমিত্ব ফলিয়ে কিভাবে মানুষ কথা বলতে থাকে, বেকুব হয়ে তাই দেখতো সে। অথচ নিজেকে জাহির করা বা কৃতিত্ব দাবি করার অভিরুচি তার হয়নি কখনো, ফলে কৃতিত্ব হাতছাড়া হয়েছে, ভুল বোঝাবুঝির শিকারও হতে হয়েছে। কিন্তু তা নিয়ে এখন আর খুব একটা দুঃখ করে না শবনম।

 

চলবে...

Header Ad
Header Ad

চিকেনস নেকে ভারী যুদ্ধাস্ত্র মোতায়েন করল ভারত

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ ও চীনকে পৃথক করেছে ভারতের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোর, যা ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত। করিডোরের এক পাশে ভারতের মূল ভূখণ্ড থাকলেও অপর পাশে রয়েছে সাতটি রাজ্য, যেগুলোর সঙ্গে কোনো সমুদ্রবন্দর নেই। ফলে এই অঞ্চলের বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে ভারতের।

সম্প্রতি (২৮ মার্চ) বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার প্রথম চীন সফরের সময় ‘সেভেন সিস্টার্স’ অঞ্চল নিয়ে মন্তব্য করেন। এতে ভারতের উদ্বেগ বহুগুণে বেড়ে যায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শিলিগুড়ি করিডোরে ভারী যুদ্ধাস্ত্র ও সেনা মোতায়েন করেছে ভারত। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।

ভারতীয় সেনাবাহিনী শিলিগুড়ি করিডোরকে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা লাইন হিসেবে উল্লেখ করেছে। দেশটির সামরিক বাহিনী সেখানে রাফায়েল যুদ্ধবিমান, ব্রহ্মোস সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, এস-৪০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং টি-৯০ ট্যাংক মোতায়েন করেছে। পাশাপাশি করিডোরের নিরাপত্তা বাড়াতে নিয়মিত সামরিক মহড়ার আয়োজন করছে।

পশ্চিমবঙ্গের এই সরু করিডোরের কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় ভারত সেখানে বহুমুখী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে উন্নত সামরিক সরঞ্জাম, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নিয়মিত সামরিক প্রশিক্ষণ। এরই মধ্যে ভারতীয় সেনাপ্রধান করিডোরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করেছেন এবং কৌশলগত প্রস্তুতি জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন।

ভারতের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক ও সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে চাইছে ভারত। এরই অংশ হিসেবে দেশটি করিডোর অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

Header Ad
Header Ad

চিত্রনায়িকা পরীমণির বিরুদ্ধে গৃহকর্মীর জিডি

চিত্রনায়িকা পরীমণি। ছবি: সংগৃহীত

চিত্রনায়িকা পরীমণির বিরুদ্ধে গৃহকর্মীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। ঢাকার ভাটারা থানায় গৃহকর্মী পিংকি আক্তার এই অভিযোগে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) পিংকি আক্তার এ জিডি করেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, পরীমণির এক বছরের মেয়ে সন্তানকে খাবার খাওয়ানো নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে গৃহকর্মীকে মারধর করা হয়।

 

ছবি: সংগৃহীত

ভাটারা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, চিত্রনায়িকা পরীমণির বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগে গৃহকর্মী থানায় জিডি করেছেন। পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছে।

Header Ad
Header Ad

পেঙ্গুইন ও পাখিদের উপরেও ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ!

ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতির বিস্তৃতি এতদূর গিয়েছে যে, জনমানবহীন দ্বীপপুঞ্জও এর আওতায় এসেছে। ভারত মহাসাগরে অবস্থিত অ্যান্টার্কটিকার জনশূন্য হার্ড ও ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপরও যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আরোপ করেছে।

এই দ্বীপপুঞ্জে মানুষের কোনো বসবাস নেই, সেখানে শুধু পেঙ্গুইন, সিল এবং পরিযায়ী পাখিরা বসবাস করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির অংশ হিসেবে এই দ্বীপপুঞ্জের ওপরও ১০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে। এর পাল্টা হিসেবে দ্বীপগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে একই হারে শুল্ক আরোপ করেছে!

অস্ট্রেলিয়ার সরকারের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, হার্ড ও ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপ বিশ্বের অন্যতম প্রত্যন্ত ও দূরবর্তী জনশূন্য অঞ্চল। আবহাওয়া পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের ফ্রেম্যান্টল বন্দর থেকে সেখানে পৌঁছাতে জাহাজে কমপক্ষে ১০ দিন সময় লাগে। দ্বীপগুলোর বাসিন্দারা শুধুই বিভিন্ন প্রজাতির সংরক্ষিত পাখি, সিল এবং পেঙ্গুইন।

ট্রাম্পের এই শুল্ক নীতির বিস্তার নিয়ে অনেকে বিস্মিত। জনমানবহীন দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে শুল্ক-সংক্রান্ত বিরোধ সত্যিই নজিরবিহীন।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Header Ad
Header Ad

সর্বশেষ সংবাদ

চিকেনস নেকে ভারী যুদ্ধাস্ত্র মোতায়েন করল ভারত
চিত্রনায়িকা পরীমণির বিরুদ্ধে গৃহকর্মীর জিডি
পেঙ্গুইন ও পাখিদের উপরেও ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ!
নেতাকর্মীদের মাঠে নামার নির্দেশ, আবারও শেখ হাসিনার উসকানি!
টাঙ্গাইলে ট্রাকচাপায় আনসার কমান্ডার নিহত
লোহাগাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনা: না ফেরার দেশে প্রেমা, নিহত বেড়ে ১১
নিষেধাজ্ঞায় পড়লেন মেসির দেহরক্ষী, ঢুকতে পারবেন না মাঠে
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চাইলো বাংলাদেশ
ঈদ আনন্দে মুখরিত রংপুরের বিনোদন কেন্দ্রগুলো
লুটপাটের পর পুড়িয়ে দেওয়া হলো বিএনপি সমর্থকের বসতবাড়ি, গ্রেপ্তার ৯
ব্যাংককে ড. ইউনূস ও নরেন্দ্র মোদির দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শুরু
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলকে অপসারণ করল আদালত
গাইবান্ধায় আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের দুই নেতা গ্রেপ্তার
সংস্কার শেষে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করাই প্রধান লক্ষ্য: প্রধান উপদেষ্টা
নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করতে হবে: টুকু
যৌথবাহিনীর অভিযান: ৭ দিনে গ্রেপ্তার ৩৪১
রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় প্রাণ গেলো নারীর
ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে পর্যটকের ঢল, হোটেলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ
ব্যাংককে ড. মুহাম্মদ ইউনূস-নরেন্দ্র মোদির বৈঠক আজ
রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়া ময়মনসিংহের ইয়াসিন নিহত