সাকিব-তামিম দ্বন্দ্ব প্রকাশ নয়, সমাধান করা উচিত ছিল বিসিবি সভাপতির

একটি বহুল প্রচারিত বিজ্ঞাপন আছে, ‘ঘরের খবর পরে জানল কেমনে’। এই ঘরের খবর নিজেরা না জানালে পরে জানার সাধ্য নেই। সাকিব আল হাসান-তামিম ইকবালের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এনে সেই কাজটি করেছেন স্বয়ং বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। ঘরের কর্তা যখন এরকম কাজটি করেন, তখন তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাতো হবেই। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে অন্দরমহলের খবর বিসিবির প্রধান কর্তা হয়ে এভাবে বলাটা কতটা যুক্তিসংগত হয়েছে?
অনেকেই মনে করছেন সাকিব-তামিম দ্বন্দ্ব যতটা না দলের ক্ষতি করেছে বা দলের উপর প্রভাব ফেলছে, বিসিবির সভাপতির প্রকাশ্যে আনায় তার চেয়ে আরও বেশি ক্ষতি করবে। দলের উপর বাজে প্রভাব পড়বে। কেউ কেউ বলছেন, এটি বিসিবি সভাপতির ‘বেফাঁস’ মন্তব্য। আবার কেউ বলেছেন এটি আর নতুন কী। এর আগেও তিনি এরকম সিনিয়রদের নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ভেতরের খবর বাইরে নিয়ে এসেছেন। আবার কেউ বলছেন, ইংল্যান্ড সিরিজকে একেবারে সামনে রেখে তার এরকম বলাটা মোটেই সঠিক হয়নি। ইংল্যান্ড সিরিজের গুরুত্বই আড়াল পড়ে গেছে! তার দায়িত্বজ্ঞান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
সাকিব-তামিম দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। বেশ কয়েক বছর থেকেই এটি চলে আসছে। এটি কম-বেশি বিসিবি, টিম ম্যানেজমেন্ট এবং দল সংশ্লিষ্ট অনেকেই অবগত। কিন্তু বিসিবি সভাপতি এমন একসময় বিষয়টি প্রকাশ্যে এনেছেন, যখন চন্ডিকা হাথুরুসিংহেকে দ্বিতীয় মেয়াদে এনে আগের মতো করে সাফল্য পেতে শুরু করার অপেক্ষায়। আবার ঘরের মাঠে কড়া নাড়ছে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ। তার এ বক্তব্য বাংলাদেশের গোট দলের মনোজগতকে সিরিজ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে। ইংল্যান্ড সিরিজকে সামনে রেখে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সফরকারী দলের অধিনায়ক জস বাটলার খেলা নিয়ে কথা বললেও বাংলাদেশের অধিনায়ক তামিম ইকবালকে এ বিষয়ে দিতে হয়েছে বেশ কিছু প্রশ্নের জবাব। এমনকি সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানিয়েছিলেন, এ বিষয়টি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে যে কথা উঠবে তা তিনি জানতেন। সেজন্য তিনি আগের দিন (শনিবার) রাত থেকে এ নিয়ে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। এভাবেই অনাহুত পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে দলের অধিনায়ককে খেলার বাইরে ছিটকে যেতে হয়েছে।
সাকিব-তামিমদের মেন্টর ও ক্রিকেট কোচ নাজমুল আবেদীন ফাহিম বিসিবির সভাপতির এরকম বক্তব্যকে মোটেও সমর্থন করেননি। তিনি মনে করেন, তার এরকম বক্তব্য সমস্যার সমাধান না করে আরও বৃদ্ধি করবে। তিনি বলেন, ‘একটা দলের ভেতর এরকম সমস্যা থাকলে সেটাকে ভেতরে রেখেই মেরামতের চেষ্টা করার প্রয়োজন। এটাকে প্রকাশ করে আরও সমস্যা বাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। বিভিন্ন মহলে এটা নিয়ে কথা হবে। এমনও কথা আসবে যেগুলো আসলে সত্যি না। আরও দূরত্ব তৈরি করবে। এটা শুধু ওদের দুইজনের মাঝে না, দলের অন্যদের মাঝেও প্রভাব ফেলবে। এটা আসলে একটা দলের জন্য ভালো না। আমরা যারা দলের কাছাকাছি থাকি তাদের কাজ হলো দলের সবাই কতটা কাছাকাছি থাকে একটা ভালো ম্যানেজমেন্ট একটা দলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত সমস্যা থাকতেই পারে। শুধু ক্রিকেটারদের নয়, যেকোনো অফিসেই এক সহকর্মীর সঙ্গে আরেক সহকর্মীর এরকম সমস্যা হতে পারে। তাই বলে কি তারা অফিসের কাজ করে না? এখানে একজনতো আরেক জনের ক্ষতি চাচ্ছেন না। পারফরম্যান্সের ব্যাপারটা যখন আসবে তখন সবাই তার সেরাটা দেওয়ারই চেষ্টা করবে। দলের চিন্তা করবে।’
জাতীয় দলে সাকিব-তামিমের অবদানের কথা উল্লেখ করে নাজমুল আবেদীন ফাহিম বলেন, ‘ওরা ১৫-১৬ বছর ক্রিকেট খেলতেছে। ওদের খেলার উপরই কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেট আজ এখানে দাঁড়িয়ে আছে। তাই এটা ভাবার কোনো কারণ নেই নিজেদের সমস্যার কারণে ওরা দলের ক্ষতি করবে। আমি এরকম একদমই চিন্তা করি না। এটা এভাবে বলে সমস্যা কমানোর রাস্তাটা ডিফিকাল্ট হয়ে গেল।’
বিসিবির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বাবু বিসিবির সভাপতির এ বক্তব্যকে সরাসরি ‘ইম্যাচিউরড’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘এটি ইম্যাচিউরড কাজ। ড্রেসিংরুমে যদি সমস্যা থেকেই থাকে, তখন সভাপতিই বলবেন এটা চাপাও। আমরা ভেতরে ভেতরে এটা সমাধানের চেষ্টা করি। কী সমস্যা হয়েছে আমরা দেখি। এটাতো ভেতরেই থাকবে। এটা ফাঁস করে দেওয়া দলের জন্য চরম ক্ষতিকর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। টুকটাক সমস্যা থাকলে বসে ঠিক করে দেবেন। অভিভাবক হিসেবে বোর্ড আছে। তারা এটা হ্যান্ডেল করবে। কিন্তু তা না করে প্রকাশ্যে আনার ফলে মানুষ এ থেকে ফায়দা নেবে। এটা দলের প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। খেলোয়াড়দের ভেতর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। আমরা এটা চাই না।’
সাকিব-তামিমের ঘনিষ্ঠতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি তারা দুইজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এর থেকে ক্লোজ ফ্রেন্ড আর হয় না। টুকটাক সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট সাহেব এভাবে বলে ভুল করছেন। এটা মিডিয়াতে কেন আনলেন? এটা টোটালি একটা আনপ্রফেশনাল কাজ হয়ে গেছে ইংল্যান্ড সিরিজকে সামনে রেখে। এর আগেও তিনি সিনিয়রদের অবসর নিয়ে মন্তব্য করেছেন। আসলে এসব কথা থেকে উনি আমাদের বিরত রাখবেন। আমাদের বলতে আমি বুঝাতে চাচ্ছি আমরা যারা বোর্ডের বাইরে আছি। তিনি বলে বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছেন।’
নাজমুল হাসান পাপনের এরকম কথা নিয়ে বিব্রত বিসিবির একাধিক পরিচালকও। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও তারা এ নিয়ে কিছু বলতে পারছেন না। আবার কেউ কেউ সাহস করে তাকে মিডিয়াতে কথা বলার জন্য একটু হিসেব করে বলার পরামর্শও দিয়ে থাকেন। কিন্তু তিনি কোনো কথাই শুনেন না বলে জানানো হয়। অতীতের মতো এবারও সাকিব-তামিম ইস্যু নিয়ে তারা ব্রিবত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ক্লাব সংগঠক বলেন, ‘তিনি এরকম বেফাঁস মন্তব্য এর আগেও একাধিকবার করেছেন। এটা তার জন্য নতুন কিছু নয়। সাকিব-তামিমের দ্বন্দ্ব আমরা যারা ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত সবাই কম-বেশি জানি। এটি নতুন নয়। বেশ কয়েক বছর হয়ে গেছে। তিনি অভিভাবক হিসেবে সমাধান না করে মিডিয়াতে প্রকাশ করে দিলেন। আমার মনে হচ্ছে এই বলার মাঝে অন্য কোনো ঘটনা আছে। হতে পারে এটি হাথুরুসিংহের কোনো প্রেসক্রিপশন। দল ভালো করতে না পারলে এই সমস্যা সামনে এনে সিনিয়রদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। তাদের সরিয়ে দেওয়ার রাস্তাও তৈরি করা হতে পারে। বোর্ড সভাপতি যে সাকিব-তামিমের দ্বন্দ্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে এটিকে সামনে নিয়ে এসেছেন, তার পরিচালকদের মাঝে এরকম সমস্যা নেই? তাদের এই সমস্যা ক্রিকেটকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এটা তাহলে তিনি প্রকাশ করুন।’
এমপি/এসজি
