কুষ্টিয়ায় জনপ্রিয়তা বাড়ছে ছাদ বাগানের

বাড়ির ছাদে ছাদে বিভিন্ন প্রজাতির ফলের গাছ। আছে নানা জাতের ফুল ও সবজি। এ যেন বিবর্ণ নাগরিক জীবনে সবুজের সমারহ। কুষ্টিয়ার বিভিন্ন বাড়ির ছাদের এমনই চিত্র এখন নজর কাড়ছে জেলার সাধারণ মানুষের। দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে নগরায়নের পরিধি ও আবাসস্থল। কমছে ফসলি জমির পরিমান। দিন দিন ছোটো হয়ে আসছে চাষাবাদের জমির পরিমাণ। অবাধে নিধন করা হচ্ছে বৃক্ষ। অন্যদিকে কংক্রিটের শহরের মানুষের গাছ লাগাবার মতো জায়গা পাওয়া এখন দুষ্কর। এর ফলে প্রকৃতিতে কমছে অক্সিজেন, বাড়ছে কার্বন নিঃসরণের পরিমান।
তবে এতো কিছুর মধ্যেও আশার আলো জাগিয়েছে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন ভবনের ছাদে গড়ে তোলা ছাদ বাগান। এসব ভবনের ছাদে এখন বিভিন্ন ধরনের ফলের গাছ ও নানা জাতের সবজি ও ফুলের চাষ করা হচ্ছে। এ যেন প্রকৃতির ধূসর বর্নের মাঝে সবুজের মোহনীয়তা। এ এক বিশুদ্ধ অক্সিজেনের কারখানা। আর এমনই বহু অক্সিজেনের কারখানা ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন কুষ্টিয়ার প্রকৃতিপ্রেমী কিছু মানুষ।
ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজের বাড়ির ছাদে অনেকেই গড়ে তুলেছেন ফল ও সবজির এবং ফুলের বাগান। এসব ছাদ বাগানে অবসর সময়ে বাগান পরিচর্যা করছেন বাগানিরা। বর্তমানে কুষ্টিয়ার ছাদ বাগানগুলোতে ঝুলছে বারোমাসি বিভিন্ন প্রজাতির আম, কমলা, মাল্টা, ডালিম, লেবু, কুল, পেয়ারা, ছবেদা, পেঁপে, জাম্বুরা, আঙ্গুর, করমচা, আমড়াসহ বিভিন্ন প্রকার ফল ও আখ। ফলের পাশাপাশি রয়েছে মরিচ, লাউ, করলা, ঢেঁড়স, ছিম, লালশাক, কলমিশাক, পুঁইশাক, ধুনিয়সহ নানা রকমের সবজি। এ ছাড়াও আছে জবা, গোলাপ, গাঁদা অপরিজিতাসহ বিভিন্ন প্রকারের ফুলের গাছ।
নিরাপদ ফল ও সবজির পাশাপাশি এসব ছাদ বাগান থেকে প্রকৃতিতে সরবরাহ হচ্ছে নিরাপদ অক্সিজেন। প্রতিটি ছাদ বাগান হয়ে উঠেছে একেকটি অক্সিজেন চেম্বার। এসব ছাদ বাগান দেখে অনেকেই নতুন করে নিজের ছাদে গড়ে তুলছেন পরিকল্পিত বাগান।
চাষাবাদের জমি কমে গেলেও বাড়ির ছাদে সবজি, ফল ও ফুলের বাগান গড়ে তোলার ফলে সৌখিনতার পাশাপাশি মিটছে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা। ছাদ বাগানীরা তাদের অবসর সময়টুকু ছাদবাগানে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষের পরিচর্যায় ব্যয় করে ফলাচ্ছেন বিষমুক্ত ফুল, ফল ও সবজি। অনেকেই নিজের পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে আত্মীয় স্বজনের পাশাপাশি প্রতিবেশিদের বাড়িতে উপহার হিসেবে পাঠাচ্ছেন নিজেদের উৎপাদিত সবজি, ফল ও ফুল।
কুমারখালী উপজেলার পৌর এলাকার ছাদ বাগানি শামীমা আক্তার বলেন, সময় কাটানোর জন্য কিছুতো একটা করতে হবে। যার জন্য ছাদটাতে প্রথমে ফুলের বাগান করি। তারপর আস্তে আস্তে সবজির বাগান করি। এভাবেই আমার বাগানটা বিশাল আকৃতির হয়েছে। এখান থেকে আমি সতেজ সবজি লাউ, মিষ্টি কুমড়া, ঢেঁরশ, পুঁইশাক, ধনিয়া পাতাসহ নানা রকম ফলের গাছ থেকে ফল পাচ্ছি। বাগান পরিচর্যা করতে করতে আমার অবসর সময়টা ভালোই কেটে যাচ্ছে।
কুষ্টিয়া শহরের এন এস রোড একতারা মোড় এলাকার ছাদ বাগানি আলমগীর কবির মিলন বলেন, ছাদে বাগান করার পরিকল্পনায় বিভিন্ন ধরনের ফলের কাছ কালেকশন করতে থাকি। আমাদের বাগানে ফল ধরতে শুরু করলে এগুলো দেখতে বেশ ভালো লাগতো। এর পর ছাদে সবজি বাগান করি। ছাদে উৎপাদিত সবজি আমাদের বাসার সবজি চাহিদা অনেকটা পূরণ করে। বাজারে সবজি পাওয়া যায় সেগুলো টাটকা না। আমার বাগানের সবজি যখন খায় স্বাদটা বাজারের কেনা সবজি থেকে অনেক ভালো। আমাদের নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপশি আমাদের ছাদে উৎপদিত সবজি ফল ও ফুল নিজেদের আত্মীয়-স্বজন প্রতিবেশিদের বাড়িতেও উপহার হিসেবে পাঠায়। বিষয়টা বেশ ভালো লাগে।
কুষ্টিয়া হাউজিং এলাকার আরেক ছাদ বাগানি লিয়াকত আলী বলেন, পুরো প্রাকৃতিক উপায়ে সার, বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ বিহীন সবজি ও ফলের জন্যে এবং বাজার থেকে যাতে সবজি বা ফল কিনতে না হয় সে জন্য মূলত ছাদ বাগান গড়ে তোলা। দিনে দিনে পৃথিবীতে সবুজ কমে যাওয়ায় অক্সিজেন কমছে চার পাশে ইট পাথরের কাঠামো গড়ে উঠছে সবুজ এখন পাওয়াই যায় না বলতে গেলে ছাদ বাগান গড়ার পেছনে নিজের আঙিনায় সবুজ দেখার উদ্দেশ্যেও রয়েছে। আমার কাছে মনে হয় শহর বা গ্রামের প্রতিটি ছাদে ছাদ বাগান গড়ে তুললে পৃথিবীর অক্সিজেনের পরিমান স্বাভাবিক থাকবে। এতে পরিবেশের ভারসম্য বজায় থাকবে।
এদিকে এসব ছাদ বাগান থেকে বিষমুক্ত সতেজ সবজিসহ বিভিন্ন প্রকার ফল ও ফুল উৎপাদন দেখে কুষ্টিয়ায় ছাদ বাগানের প্রতি দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে সাধারণ মানুষের এমনটা মনে করছে জেলা কৃষি বিভাগ।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. হায়াত মাহমুদ বলেন, ছাদ বাগান যেমন প্রকৃতিতে অক্সিজেন সরবরাহে সহযোগিতা করছে, তেমনি যারা ছাদ বাগান গড়ে তুলেছেন তারা বিষমুক্ত সতেজ সবজিসহ বিভিন্ন প্রকার ফল ও ফুল উৎপাদন করে নিজেদের চাহিদাও মিটাচ্ছেন। আমরা চেষ্টা করছি কুষ্টিয়া জেলায় ছাদ বাগান বাড়াতে সে অনুযায়ী জেলা ও উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা নিয়মিত কাজ করছেন। এর ফলে কুষ্টিয়া জেলা শহর ও উপজেলা শহরের ছাদ বাগান বাড়তে শুরু করেছে। বিষমুক্ত সতেজ সবজিসহ বিভিন্ন প্রকার ফল ও ফুল উৎপাদন দেখে ছাদ বাগানের প্রতি দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে ভবন মালিকদের মাঝে।
তিনি আরও বলেন, জেলা ও উপজেলা কৃষি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে পরিবেশ রক্ষায় ছাদবাগান সম্প্রসারণে ছাদ বাগনীদের বাগান পরিচর্যা করতে নানা রকম পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
এএজেড
