ফিরে দেখা ২০২১
মসনদ দখলে নিল তালেবান

কাবুলের সিংহাসন থেকে তালেবানকে হটানো হয়েছিল ২০০১ সালে। আর দীর্ঘ ২০ বছর পর ২০২১ সালে মসনদে ফিরে আসে তারা। আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহরের ঘোষণা দেয়ার পর অত্যন্ত দ্রুত গতিতে তালেবানরা দখলে নিতে থাকে আফগানিস্তানের বিভিন্ন এলাকা। গত ১৫ আগষ্ট তারা ঢুকে পড়ে কাবুলের প্রেসিডেন্ট প্যালেসে। এর আগেই আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। বলা যায় রক্তপাতহীন অভিযানেই তালেবানরা আফগান মসনদে ফিরে আসে।
তালেবান সরকারকে ইতিমধ্যে স্বীকৃতি দিয়েছে বেশ কয়েকটি দেশ। এ তালিকায় চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলো ছাড়াও রয়েছে প্রতিবেশী পাকিস্তান ও তুরস্কের নাম। চীন বলছে তারা তালেবানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার জন্য প্রস্তুত। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনিয়াং সাংবাদিকদের বলেন, আফগান জনগণের নিজেদের লক্ষ্য নির্ধারণের স্বাধীন অধিকারকে চীন সম্মান জানায়। চীন আফগানিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সহযোগিতামূলক সম্পর্ক করতে প্রস্তুত।
আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান বরাবরই তালেবানকে সমর্থন জানিয়ে আসছে। তালেবানের বিজয়ের পর ইমরান খান বলেন, আফগানিস্তানে এখন যা ঘটছে, তাতে তারা (তালেবান) দাসত্বের শেকল ভেঙে দিয়েছে। এদিকে রাশিয়াও তালেবানদের স্বীকৃতী দেওয়ার বিষয়টি সামনে এনেছে।
তালেবান ক্ষমতা দখলের পর তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান জানান, তালেবানের উচিত তাদের ভাইদের ভূমির দখলদারি বন্ধ করা। আফগানিস্তানে যে বর্তমানে শান্তি বিরাজ করছে সেই বিষয়টি বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করা উচিত। এরদোগান বলেছেন, তার দেশ পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতার জন্য কাজ করবে। এ ব্যাপারে যথাসাধ্য সবকিছুই করা হবে। এছাড়া কাতার ও ইরানও আফগানিস্তানের তালেবান সরকারকে সমর্থন জানাতে পারে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম খবর দিয়েছে।
তালেবানদের কেন সমর্থন ও স্বীকৃতি জরুরি:
১৫ আগষ্ট কাবুল দখলের পর সংবাদ সম্মেলনে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ। এবার দেশ শাসনের আসল দায়িত্ব নিতে হবে তাদের। রাজকার্যের দায় বড় দায়; আধুনিক বিশ্বে যা শুনতে সহজ শোনালেও বাস্তবে আরও কঠিন।
১৯৯৬ সালে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহার পরবর্তী সময়ে গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত ছিল গোটা আফগানিস্তান। বুলেট বা রকেট চালিত গ্রেনেড থেকে রক্ষা পাওয়া ইমারতগুলি হাতেগোনা যেত যেন। সব অবকাঠামোর তখন ভঙ্গুর দশা, বাঁধগুলো কাজ করছিল না, সড়ক চাপা পড়েছিল ধ্বংসস্তূপে, যুদ্ধবাজ, দাঙ্গাবাজ গোষ্ঠীর চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী পণ্য বহন বন্ধ হয়ে পড়ছিল। শহরগুলো বোমার আঘাতে তখন ইট-পাথরের স্তূপ। তারমধ্যেই মাথা গুঁজে বাঁচার চেষ্টা করছিল সাধারণ আফগানরা।
এই অবস্থায় কয়েক বছর ধরে বন্ধ ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রম। সমর্থনকারী কোন কর্তৃপক্ষ না থাকায় জাতীয় মুদ্রা- আফগানির মূল্য তলানিতে পৌঁছাতে থাকে। ১৯৯৬ সালে তালেবান যখন ক্ষমতায় আসে তখন দেশজুড়ে অন্তত চারটি ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রা প্রধান বিনিময়ের মাধ্যমে ছিল। অঞ্চলভেদে কোন মুদ্রার প্রচলন নির্ভর করতো। অর্থনীতির বেশিরভাগ নিয়ন্ত্রণ করতো চোরাকারবারি ও চাঁদাবাজেরা। দেশের কোনো স্থানেই উল্লেখযোগ্য কোন স্থায়ী বিনিয়োগ করছিল না কেউ।
১০ লাখ স্কুল শিক্ষার্থীর অধিকাংশই ছিল ছেলে, কিন্তু পুরো দেশেই ভেঙে পড়েছিল শিক্ষা ব্যবস্থা। ছিল না সচল কোন উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। এমনই এক আফগানিস্তানকে করায়ত্ত করেছিল তালেবান।
সে তুলনায়, আজ যে আফগানিস্তান তারা দখল করেছে, তার বৈদেশিক রিজার্ভ কমবেশি ৯০০ কোটি ডলার (সবটাই বিদেশে গচ্ছিত)। আছে বেসরকারি খাতের উদ্যোগ, একটি কার্যকর কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং মুদ্রা সরবরাহ ও বিনিময় হার নির্ধারণের মতো সহায়ক আর্থিক ব্যবস্থা।
যোগাযোগ খাতেও এসেছে উন্নতি। ২,০০০ কিলোমিটার সড়ক বর্তমানে সব কয়টি প্রাদেশিক রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধা দিচ্ছে। প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিদ্যুৎ আমদানির জন্য বসানো হয়েছে চারটি দীর্ঘ দূরত্বের ট্রান্সমিশন লাইন। লাইনগুলোর মাধ্যমে চাহিদার সিংহভাগ বিদ্যুৎ প্রতিবেশী তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও ইরান থেকে আমদানি করা হয়। মার্কিন সরকারের সহযোগিতা ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে বাস্তবায়িত হয়েছে এসব প্রকল্প। ফলে আফগানিস্তানের শহরাঞ্চলে আধুনিকতার বিকাশও ঘটেছে দ্রুত। এক কোটি শিক্ষার্থী বিদ্যালয় ও উচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়ছে এখন, যা অর্থবহ অগ্রগতি।
একথা সত্য, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত আফগান সরকার ছিল দুর্নীতি ও অযোগ্যতার জন্য সবিশেষ পরিচিত (আসলে কুখ্যাত), প্রকল্প বাস্তবায়নে তারা সীমাহীন দুর্নীতি করেছে। কিন্তু, আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর নজরদারিতে অনেক প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ায় জনগণ সুফল পাচ্ছে।
মার্কিনীদের ইরাক দখলের সঙ্গে আফগানিস্তান দখলের তুলনা দেওয়া হচ্ছে। তখন প্রবল জন-প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল আগ্রাসী বাহিনী। আর আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভে হন্যে হয়ে ফিরছিল বুশ প্রশাসন। কারণ, তারা উপলব্ধি করে, বহির্বিশ্বের সমর্থন ছাড়া বাগদাদে বসানো পুতুল সরকার টিকতে পারবে না।
বাগদাদ পতনের পরবর্তী সংকটগুলো মোকাবিলায় ব্যর্থ হয় যুক্তরাষ্ট্র, ফলে ইরাক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সেদিক থেকে আশার কথা হলো, কোনো পক্ষই তালেবান সরকার ব্যর্থ হোক তা চায় না। তাদের জানা আছে, আফগানিস্তান তাতে করে নৈরাজ্যের অন্ধকূপে ফিরে যাবে, বন্ধ হবে না অস্ত্রের ঝনঝনানি। গৃহযুদ্ধ দেশটিকে তলিয়ে নেবে অন্ধকার যুগে। পরিণত হবে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের ডেরায়, আর সেখানেই বড় ভয় সবার।
শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সকলের এ প্রত্যাশার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বৈধতা পাওয়ার চেষ্টা করছে তালেবান। বৈধতা পেলে তারপর সাহায্যের আবেদনও করবে, এবং তাদের জানা আছে অনুদান ও ঋণ ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা প্রায় অসম্ভব।
কেএফ/
