রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাই জরুরি ভিত্তিতে প্রকল্পটি পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির সর্বশেষ অগ্রগতি, কত টাকা খরচ হলো, প্রকল্পটি পুরোপুরি শেষ হতে কত দিন সময় লাগবে—এসব বিষয়ে তথ্য দিতে হবে প্রকল্প পরিদর্শকদের।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পটি পরিদর্শন করবে। ১০ মার্চ আইএমইডির সমন্বয় সভায় জরুরি ভিত্তিতে প্রকল্পটি পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী মাসে সমন্বয় সভায় এ নিয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির অগ্রগতি বিবেচনা করে এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনুসারে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এর মানে, যত টাকা খরচ করা হলো, তাতে বিনিয়োগ ওঠে আসতে কত দিন লাগবে, তা–ও বিবেচনা করা হবে বলে জানা গেছে। এই প্রকল্পের জন্য রাশিয়ার কাছ থেকে বিদেশি ঋণ পরিশোধ শুরু হলে তা অর্থনীতির ওপর কী ধরনের চাপ ফেলতে পারে, সেটা বিবেচনায় থাকবে।
আইএমইডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নীতিনির্ধারকদের উচ্চ পর্যায় থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনের কথা বলা হয়েছে। তিনি জানান, অনেক টাকা খরচ হয়ে গেছে, তাই হয়তো প্রকল্পটি বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু অর্থনৈতিক সুবিধার মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন।
রূপপুর প্রকল্পে খরচ হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২২ হাজার ৫২ কোটি ৯১ লাখ ২৭ হাজার টাকা। আর রাশিয়া থেকে ঋণসহায়তা হিসেবে আসছে ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা।
২০২১ সালের অক্টোবরে রূপপুরে প্রথম ইউনিটের ভৌত কাঠামোর ভেতরে চুল্লিপাত্র স্থাপন করা হয়। চুল্লিপাত্র হচ্ছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল যন্ত্র। এই যন্ত্রের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়াম লোড করা হয়। গত বছরের অক্টোবরে বসানো হয় দ্বিতীয় ইউনিটের চুল্লিপাত্র। ২০২৫ সালের শেষ দিকে উৎপাদনে যেতে পারে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট।
২০২৭ সাল থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণ পরিশোধ শুরু হবে। অবশ্য বাংলাদেশ এই ঋণ পরিশোধ শুরু আরও দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য দেনদরবার করছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মেগা প্রকল্পগুলোর মূল্যায়নের বিষয়টি আলোচনায় আসে। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে প্রকৃত অর্থে খরচ কত হতো, বিদেশি ঋণের শর্ত কী, মেয়াদ—এসব নিয়ে সরকার গঠিত অর্থনীতি নিয়ে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি কাজ করেছে।
গত সরকারের নেওয়া মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে বর্তমানে চলমান যেসব প্রকল্প, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মেট্রোরেল প্রকল্প, পায়রা সমুদ্রবন্দর, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র।
পায়রা বন্দর পর্যালোচনার দায়িত্ব পরিকল্পনা উপদেষ্টার
আরেক মেগা প্রকল্প পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণের অর্থনৈতিক উপযোগিতা নিয়ে বর্তমান সরকার প্রশ্ন তুলেছে। একাধিকবার সংশোধন করে এখন এই প্রকল্পের খরচ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২২৮ কোটি টাকা।
২৩ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পায়রা বন্দর প্রকল্প মূল্যায়ন ও সরেজমিন পরিদর্শনের জন্য পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। শিগগিরই তিনি পায়রা বন্দর প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করবেন।
এই বন্দরের মূল সমস্যা হলো এই বন্দর সচল রাখতে সারা বছর ড্রেজিং করতে হবে, যা বেশ ব্যয় সাপেক্ষ। দুটি ড্রেজার সব সময় লাগবে।
পায়রা বন্দর অর্থনীতির জন্য বিষফোড়া বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। গত রোববার সাংবাদিকদের কাছে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ আরও বলেন, ‘পায়রা সমুদ্রবন্দর বলা হলেও মূলত একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা আনতে এ বন্দর করা হচ্ছে। পায়রাবন্দর তো সমুদ্রবন্দর হওয়া দূরের কথা, আবার নদীবন্দরও হবে না। অনেকটা ঘাটের মতো হতে পারে। ছোট ছোট নৌযান চলাচলের উপযোগী বন্দর। এ পায়রা বন্দর প্রকল্পে অনেক অর্থ খরচ হয়ে গেছে। মাঝপথে এসে প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হবে কি না, তা বিবেচনার বিষয়। তিনি আরও বলেন, ‘প্রকল্প খরচ শুরুর আগে বা প্রকল্প নেওয়ার আগে থাকলে এই প্রকল্প নিতাম না।’